যদি করো ফলের চাষ অর্থ-পুষ্টি বারোমাস

Cultivation of fruits makes money and nutrition through the Twelve months

ড. মো. বায়েজিদ মোড়ল: ফল আমাদের খাদ্য তালিকার এক অন্যতম উপাদান। নানাবিধ ফলে রয়েছে নানাবিধ পুষ্টি। পাশাপাশি আমাদের রসনাবিলাসে এর কোন বিকল্প নেই। অর্থ উপার্জনে এর রয়েছে এক বিশাল বাজার, যা স্বাবলম্বি করতে পারে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠানকে, বিরাট ভূমিকা রাখতে পারে একটি দেশের জাতীয় অর্থনীতিতে। বাংলাদেশে এখন দেশী জাতের পাশাপাশি অধিক ফলনশীল, অনেক সুস্বাদু বিদেশী জাতের ফলের চাষ হচ্ছে। এখানে দেশী-বিদেশী জাতের বেশ কিছু ফলের চাষাবাদ তুলে ধরা হলো।  

আমলকি

আমলকি Anola( Emblica officianalis or Phyllanthus emblica L., Euphorbiaccae) পরিবারভূক্ত পত্র পতনশীল বৃক্ষ। বেলে মাটি  ছাড়া অন্য সবধরনের মাটিতেই জন্মে। আবাদের জন্য পানি নিস্কাসনের সুবিধা সহ উঁচু জমি নির্বাচন করতে হয়ে।

জাত: বাংলাদেশে আমলকির তেমন কোন জাত নেই। বেনারসী, হাতিজল, বনসি লাল ইত্যাদি জাতগুলো ভারতের উল্লেখযোগ্য জাত।

বংশ বিস্তার: প্রধানত বীজ থেকে চারা হয়। আমলকির বীজ ২দিন পানিতে ভিজিয়ে রেখে বুনলে অঙ্কুরোদগমে সুবিধা হয়। ১ বৎসর বয়সের চারা রোপন করা উচিত। ১ বৎসর বয়সের চারায় ভাল জাতের সায়ন ঞ কলমের সাহায্যে অতি সহজে স্থাপন করা যায়। বীজ থেকে চারা করলে ফলন আসতে প্রায় ১০ বৎসর সময় লাগে।

উৎপাদন পদ্ধতি: এখনো বাংলাদেশে আমলকির চাষ জনপ্রিয় হয়ে উঠেনি। পরিল্পনা মাফিক চাষ করতে হলে ৯ মিটার দুরত্বে ৬০ x৬০x ৬০ সে.মি গর্তে ১৫ কেজি  গোবর, ৫০০ গ্রাম টি.এস.পি মাটির সাথে মিশিয়ে গর্ত ভর্তি করে চারা রোপন করা যাবে। ফলন্ত গাছে প্রতি বছর ৪০ কেজি জৈব সার, ১ কেজি ইউরিয়া, ১ কেজি টি.এস.পি ও ১ কেজি এম.পি দুই ভাগে ভাগ করে বর্ষার আগে একবার ও পরে আরেকবার প্রয়োগ করলে ভাল ফলন পাওয়া যায়।

পরিচর্যা: প্রয়োজন মত সেচ, পানি নিস্কাশন ও কোপিয়ে আগাছা পরিস্কার করতে হবে। শীতের সময় অতিরিক্ত কিছু চিকন ডাল ও মরা ডাল ছেটে দিতে হবে।

পোকামাকড় ও রোগবালাই: কান্ড ছিদ্র কারী পোকার আক্রমন মাঝে মধ্যে লক্ষ করা যায়। সুমিথিয়ন ২ মি.লি./ লি. পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করলে এ পোকা দমনে রাখা যায়। কান্ডের গর্তে আলকাতরা ঢুকিয়ে ছিদ্র বন্ধ করে দিয়ে পোকা মারা যায়।

ফসল সংগ্রহ ও ফলন: আমলকির সুষ্প মঞ্জরিতে স্ত্রী ফুল গুলোর নিচে আলাদা ভাবে পুরুষ ফুল ধরে। বসন্ত কালে গাছে ফুল আসে এবং শীতের প্রথম দিকেই ফসল সংগ্রহ করা যায়। পুষ্টফলের রং উজ্জ্বল ও হলুদাভ হয়ে উঠে। প্রতি গাছে ২০০-৩০০ কেজি ফল পাওয়া যায়।

পুষ্টিমান ও ব্যবহার: আমলকি অত্যন্ত পুষ্টি সমৃদ্ধ ফল। বাংলাদেশের অন্য কোন ফলে- আমলকির মতো ভিটামিন সি নেই। ১০০ গ্রাম ফলে ৭০০ গ্রামের মত ভিটামিন সি পাওয়া যায়।  এ ফলটিতে ভিটামিন বি১, বি২, নিকোটেনিক এ্যসিড যথেষ্ট রয়েছে। এ ছাড়া রয়েছে আমিষ ০.৫%, চর্বি ০.১%, শর্করা ১৪%, লৌহ ১.২ %। আমলকি ফল টক। কাচা শুকনা বা পাউটার করে খাওয়া যায়। আমলকি দিয়ে মোরব্বা ও জেলি বানিয়ে খাওযা যায়। ফলের ঔষধি গুন ও প্রচুর। পেটের পীড়া, যকৃতের অসুখ ও কাশিতে এ ফলের রস ব্যবহার হয়। আমলকির পাতার রস আমাশয় প্রতিষেধক।

আমড়া

আমড়া (Hog plum): Sapondias pinnata. L., Anacardiaceae পরিবার ভুক্ত ফল। মাঝারি ধরনের পত্র পতনশীল বৃক্ষ। সিলেট, চট্টগাম, বরিশালে প্রচুর পরিমানে পাওয়া যায়। এ ছাড়া অন্য জেলাগুলোতে ও কোথাও কোথাও বাড়ীর আঙ্গিনায় দেখতে পাওয়া যায়। আমড়া এদেশের আদি ফল। এক সময়ে বনে বাদাড়েই জন্মাতো, বর্তমানে এর কদর বেশ বেড়েছে- এখন বাজারে যথেষ্ট পাওয়া যায়, চাহিদও আছে প্রচুর।

জাত: দেশী ও বিলাতি।

বংশ বিস্তার: বীজ থেকে সাধারণত চারা উৎপন্ন করে বংশ বৃদ্ধি হয়। বীজের অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা খুব কম বলে-পাকা ফলের বীজ সাথে সাথে পুতে দিতে হয়। আমড়ার বীজে একাধিক চারা হয়। এর মাঝে, সতেজ চারাটি রেখে বাকি গুলো ফেলে দিতে হয়।

উৎপাদন পদ্ধতি: ৮ মি. দুরত্বে ৫০x৫০x ৫০ সে.মি গর্তে ১০ কেজি গোবর ও ৫০০ গ্রাম টিএসপি দিয়ে মাটি ভড়াট করে দিতে হয় এবং ১ বছর বয়সের সতেজ, সবল ডাল থেকে কাটিং করেও বংশ বৃদ্ধি করা যায়। আগষ্ট-সেপ্টেম্বরে ফল পাকে ও বীজ থেকে চারা লাগানো হয়। এ সময়ে কাটিং ও করা যায়।

ফসল সংগ্রহ ও ফলন: পাঁচ বৎসরেই আমড়ার ভাল ফলন আশা করা যায়। শীতে গাছের পাতা ঝরে যায়- বসন্তে ফুল আসে। গাছ প্রতি গড়ে ২৫০ কেজি ফলন পাওয়া যায়।

পোকা মাকড় ও রোগবালাই: এক ধরনের পাতা খেকো পোকার বয়স্ক ও শুককিট গাছের সব পাতা খেয়ে ফেলে। হলুদ রং এর ডোরাকাটা পোকাগুলি আমড়া গাছের প্রচুর ক্ষতি করে। সেভিন পাউডারের ০.২৫% দ্রবন ¯েপ্র করলে উপকার পাওয়া যায়। এ ছাড়া কান্ড ছিদ্রকারী পোকাও দেখা যায়। কান্ডের ছিদ্রে তুলায় কেরসিন লাগিয়ে ঢুকিয়ে দিয়ে সিমেন্ট বা আলকাতরা দিয়ে বন্ধ করে দিতে হয়। ডাইবেক ছাড়া অন্য কোন রোগ আমড়ায় নেই বললেই চলে।

ফল সংগ্রহ ও ফলন: ৫-৬ বৎসর বয়সে ফল আসে। প্রতি গাছে গড়ে ২০০ কেজি ফলন হয়। আগষ্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ফল পাওয়া যায়।

পুষ্টিগুণ ও ব্যবহার: ফলে প্রচুর পরিমানে ভিটামিনএ, বি, সি ক্যলসিয়াম লৌহ ও শ্বেতসার থাকে। ফলে লবন মাখিয়ে আধা পাকা অবস্থায় খাওয়া যায়। ফল দিয়ে মুখরোচক চাটনি ও আচার তৈরি হয়।

আম্রপালী

ভারতীয় নীলম ও দশোহরী জাতের শংকরে তৈরী বারি আম-৩ একটি উন্নত জাতের আম যা আম্রপালী  নামে পরিচিত। বারি আম-৩ বা আম্রপালীর বৈশিষ্ট্য:

১.            প্রতি বছর ফল দেয়।

২.           প্রতিটি আমের গড় ওজন ২০০-৩৫০ গ্রাম।

৩.           মিষ্টির পরিমান প্রায় ২৩% ভাগ।

৪.           শ্বাঁস রাসালো, আঁশ বিহীন বলে কড় মিষ্টি লাগে খেতে।

৫.           শ্বাঁস গাঢ়ো কমলা রংয়ের, খাবার সময় সুগন্ধি বের হয়।

৬.           খোসা পুরু হওয়ায় পাকা আম বাসায় স্বাভাবিক আবহাওয়ায় কয়েকদিন সংরক্ষন করে রাখা যায়।

৭.           আটি ছোট। আহার উপযোগী অংশ প্রায় ৭০%।

৮.           নাবী ও বেঁটে জাত। জুলাই এর প্রথম সপ্তাহে বা আষাঢ়ের তৃতীয় সপ্তাহে পাকে।

বারি আম-৩ বা আম্রপালী গাছ রোপনের নিয়ম:

বছরের যে কোন সময় বারি আম-৩ বা আম্রপালী আমগাছ রোপন করা যায় তবে জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাসে চারা রোপনের জন্য বেশি উপযোগী। রোপনের সময় গতের মাপ ৯০ সে.মি. ঢ ৯০ সে.মি. হওয়া উচিত। প্রতি গতে ৪০ কেজি পঁচা গোবর সার এবং ২০০ গ্রাম ডিএপি ও ২০০ গ্রাম পটাশ সার ভালভাবে মিশিয়ে সাত দিন পর চারা রোপন করতে হবে।

বারি আম-৩ বা আম্রপালী গাছ রোপনের মাটি কেমন হবে :

সুনিস্কাশিত উর্বর বেলে দো-আঁশ সামান্য অম্লীয় মাটি বারি আম-৩ বা আম্রপালী চাষের জন্য বেশী ভাল। তবে বাংলাদেশের প্রায় সকল এলাকায় বারি আম-৩ বা আম্রপালী আম জন্মায়। ছায়া স্যাঁতসেতে জমিতে গাছ লাগানো উচিৎ নয়।

খর্বাকৃতির বেটে স্বভাবের এবং প্রতিবছর ফল দেয়ার জন্য বাণিজ্যিক ভিত্তিতে আম চাষ করার ক্ষেত্রে বারি আম-৩ বা আম্রপালী অত্যন্ত ভাল জাত।

বারি আম-৩ বা আম্রপালী গাছের সাথী ফসল :

পরিকল্পিতবাবে বারি আম-৩ বা আম্রপালীর বাগান করলে নিয়মিতবাবে আন্তঃফসল আবাদ করা যায় এবং প্রথম ৫ বছরে বাঁধাকপি, ফুলকপি টমেটো, লালশাক, মিষ্টিকুমড়া, ওল, মুলা, বেগুন, মরিচ, ধরনের শস্য বিন্যাশ বেশ লাভজনক। ৬ষ্ঠ বছর থেকে আদা ও হলুদ চাষ করা যেতে পারে। বারি আম-৩ বা আম্রপালী বাগানের চতুর্দিকে বর্ডার ফসল হিসেবে কাগজী লেবু ঘন করে (৫০ সে.মি.) দুরত্বে রোপন করলে ঘেরা বেড়ার পাশাপাশী অতিরিক্ত আয়েরও ব্যবস্থা হবে। আন্তঃফসল চাষে অসুবিধা হলে বর্ডার এবং বারি আম-৩ বা আম্রপালী আমের মাঝের অংশে ভাল জাতের পেয়ারা আবাদ বেশ লাভজনক।

বারি আম-৩ বা আম্রপালী গাছ রোপনের পর বিশেষ পরিচর্যা :

১.            বারি আম-৩ বা আম্রপালী গাছের চারা রোপনের সাথে সাথে খুঁটি দিয়ে চারা বেঁধে দিতে হবে। বাতাসে যাতে কোন ভাবে গাছ হেলে পড়তে না পারে। বাতাসে গাছের গোড়া নড়ে গেলে গাছ পানি শূণ্য হয়ে মারা যেতে পারে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। 

২.           গাছ যদি কলম হয় সেক্ষেত্রে গাছ রোপনের পর কলমের জোড়ার নিচের অংশে কুশি বের হলে সঙ্গে সঙ্গে তা কেটে দিতে হবে। মনে রাখতে হবে যে কোন কলমের চারার জোড়ার নিচের অংশ জংলী প্রজাতির হয়।

৩.           প্রয়োজনে উপযুক্ত বালাইনাশক প্রয়োগ করতে হবে। যাতে কোনভাবে রোগ বালাই বা পোকা মাকড় গাছকে আক্রমণ করতে না পারে।

৪.           আমের বোল বের হওয়ার ১ মাস আগে  একবার ¯স্প্রে করতে হবে।

চারা/কলম মাটিতে রোপনের আগে ও পরে নিম্নে বর্ণিত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে :

১.            সম্পূর্ণ ছায়ায় রাখতে হবে।

২.           কোন অবস্থায় টিনের চাউনির নিচে/ পাকা মেঝের উপর রাখা যাবে না।

৩.           শীতে/গরমে প্রয়োজনমত পানি ¯েপ্র করে পাতাকে সজীব রাখতে হবে। সাধারণত ২-৪ বার পানি ¯েপ্র করা প্রয়োজন হয়। প্রতিদিন কি পরিমান ও কতবার পানি ¯েপ্র করবেন তা ঐ সময়ের তাপমাত্র, আদ্রতা/শুষ্কতাবিবেচনা করে নিজেরা ঠিক করে নিতে হবে। প্রয়োজন পাতা সজীব রাখা, সর্বদা ভিজে থাকা নয়।

৪.           গোড়ার মাটি যেন স্বাভাবিক ভেজা থাকে সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

৫.           হার্ডেনিং করা না থাকলে চায়াতে ১৫-২০ দিন রেখে উপরোক্ত পরিচর্যা করার পর যত দ্রুত সম্ভব রোপন করতে  হবে। হার্ডেনিং করা থাকলে সাথে সাথে রোপন করা উত্তম।

৬.           যে সকল স্থানে পূর্ব দিক থেকে সূর্যের আলো সরাসরি লাগে না বা সব সময় স্যাত স্যাতে থাকে সেখানে এ গাছ লাগানো উচিত নয়।

৭.           বৃষ্টি পড়তে থাকা অবস্থায়, গর্তে পানি জমে থাকা অবস্থায় কিংবা গর্তের মাটি কর্দমাক্ত থাকা অবস্থায় চারা লাগাবেন না। যদি লাগাতেই হয় তবে কান্ডের গোড়ার মাটি সুতালি দিয়ে বেধে দিতে হবে।

৮.           চারা বিকালে লাগানো উত্তম।

৯.           এক গাছ থেকে অন্য গাছের দুরত্ব হবে-৩ঢ৩, ৪ঢ৪, ৪ঢ৩ মি., মাঝারি জাতের হলে ৫ঢ৪, ৫ঢ৫,৬ঢ৬ মি.

১০.        গর্ত করতে হবে বৃত্তাকারে। গর্তের মাপ হবে-ব্যাস ৯০ সে.মি. গভিরতা ৬০-৯০ সে.মি.প্রতি গর্ত থেকে উটানো মাটির সাথে কোন প্রকার কাঁচা বা টাটকা গোবর প্রয়োগ করা যাবে না। সুসম মাত্রায় জৈব অজৈব সার মিশৃত করে প্রয়োগ করতে হবে। গর্তের মাপ ছোট করা যাবে না।মাটির সাথে ছাড়া কেবলমাত্র সারঘুরি একত্রে মিশাবেন না। প্রতিটি সার পৃথক পৃথকভাবে মাটিতে দিবেন এবং যত দ্রুত সম্ভব মাটির সাথে মিশিয়ে ফেলবেন।

১১.         সার মিশানো মাটি গর্তের ভিতর ভালো করে চেপে ভর্তি করতে হবে। এরপর গর্তের উপরের অংশের ব্যাস ৯০সে.মি. জায়গার মাটিতে রিজেন্ট ২.৫ গ্রাম এবং ব্যাভিষ্টিন ০.২৫ গ্রাম অথবা কম্পানিয়ন ০.৫. গ্রাম ছিটিয়ে ভালভাবে মিশাতে হবে। এ সময় বর্ষা না থাকলে গর্তে পর্যাপ্ত পানি দিতে হবে। এর ১৫-২০ দিন পর চারা লাগাতে হবে। চারা লাগানোর পূর্বে বৃষ্টি না হলে মাঝে মাঝে পানি দিয়ে সার মিশানো মাটি ভিজিয়ে মাটেতে জো সৃষ্টি করতে হবে।

১২.        গর্তে সার দেয়া সম্ভব না হলে উরের মাটি নিচে আর নিচের মাটি উপরে করে গর্ত বরাট করতে হবে। এ সময় বৃষ্টি না হলে মাঝে মাঝে পানি দিয়ে মাটি ভিজিয়ে রাখতে হবে। মাটিতে জো আসলে গর্তের মাঝখানে চারা রোপন করতে হবে।

১৩.        নার্সারীতে থাকাকালীন চারা / কলমের যতটুকু অংশ মাটিতে পোতা ছিল। গাছ লাগানোর সময় তার চেয়ে ২-৪ সেন্টিমিটার বেশি পুত্তে হবে।

১৪.        নার্সরীতে থাকাকালীন গোড়ায় যে পরিমান মাটি থাকে তার চেয়ে বেশি পরিমান গর্ত করতে হবে। গর্তের মাঝকানে চারা বসিয়ে গুলের মাটি ও গর্তের মাটির মধ্যেকার ফাঁকা স্থানে গুড়া মাটি দিয়ে আঙ্গুলের সাহায্যে তা নিচে চেপে ফাঁকা স্থান ভরতে হবে। যেন গুলের মাটি না ভাঙ্গে অথচ গুলের মাটির সাথে গর্তের মাটি ভাল ভাবে মিশে যায়। এবং গাছের গোড়ার মাটি একটু উচু রাখতে হবে পানি গাছের গোড়ায় জমতে দেয়া যাবে না।

১৫.        চারা লাগানোর পর সকল পাতা ও ডাল ঝরনার সাহায্যে পানি ঢেলে ধুয়ে দিতে হবে এবং গোড়ায় পানি দিতে হবে।

১৬.        লাগানো চারার পাশে বাঁশ বা শক্ত কাটি পুতে তার সাথে বেঁধে দিতে হবে যাতে বাতাসে গাছ ঢলে পড়া বা গোড়া নড়ে না যায়।

১৭.        গাছ যদি কলম হয় সেক্ষেত্রে গাছ রোপনের পর কলমের জোড়ার নিচের অংশে কুশি বের হলে সঙ্গে সঙ্গে তা কেটে দিতে হবে। মনে রাখতে হবে যে কোন কলমের চারার জোড়ার নিচের অংশ জংলী প্রজাতির হয়।

১৮.        গাছ যদি কলম হয় সেক্ষেত্রে গাছ রোপনের পর কলমের জোড়ার নিচের অংশে কুশি বের হলে সঙ্গে সঙ্গে তা কেটে দিতে হবে। মনে রাখতে হবে যে কোন কলমের চারার জোড়ার নিচের অংশ জংলী প্রজাতির হয়।

১৯.        চার/কলমের নতুন পাতা আসার সাথে সাথে কীট ও ছত্রাক নাশক ঔষধ একত্রে পাতা এবং কান্ডে ¯েপ্র করতে হবে। এখানে ছত্রাক নাশক নুট্রাফস-এন ৩ গ্রাম প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে ¯েপ্র করা যেতে পারে।

২০.        প্রথম বছরে আসা সকল মুকুল ভেঙ্গে দিতে হবে। তা না হলে পরবতি বছরের গাছের বৃদ্ধি বাধাপ্রাপ্ত হবে। তুলনামূলকভাবে গাছে চিরদিনের জন্য ফলন কম হবে। এমনকি মারা যাবারও সম্ভাবনা বেশি থাকে।

২১.        গাছে ফুল থাকা অবস্থায় সেচ দিলে ফুল ঝরে যাবে। সে ক্ষেত্রে গাছের গোড়ায় সেচ দিতে হবে।

২২.        ফল পাকার পূর্বে বেশি বেশি সেচ দিলে ফল পাকতে দেরি করবে এবং ফল মিষ্টি কম হবে।

২৩.        বাগানে ঘাস থাকলে গাছে ফুল ও ফল কম ধরবে এবং ফল তুলনামূলক ছোট হবে।

গাছ লাগানোর সময় ও পরের বছরগুলিতে ব্যবহৃত সারের বিবরণ:

গাছের ভাল বৃদ্ধি ও উৎকৃষ্টমানের বেশি ফলনের জন্য চাই চাহিদা মতো সুষম সার। পরিপুরক সার ব্যবহারের সুপারিশ নির্ভর করবে বাগানের মাটির গঠন ও তার উর্বরতার উপর বাগানের মাটি ও গাছের পাতা পরীক্ষার পর সেখানে তাকা খাদ্যমানের উপর ভিত্তি করে চাহিদা মতো সার প্রয়োগ উত্তম।

১.     যেখানে মিউরেট অব পটাশ (এমওপি) দিতে বলা আছে সেখানে এমওপি থেকে ২০% বৃদ্ধি করে পটাশিয়াম সালফেট(এসওপি) দেয়া যাবে। এসওপি দেয়া হলে সে ক্ষেত্রে মোট এসওপি-র ৭৫% গুঁড়া এবং ২৫% দানা প্রয়োগ করা উত্তম।

২.           রোপন থেকে নূন্যতম ২১ দিন পর ইউরিয়া ১৫০ গ্রাম এবং এরপর ১ মাস পরপর ইউরিয়া ১৫০ গ্রাম করে অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত যে কয়বার সম্ভব উপরি প্রয়োগ করা যাবে। গাছের গোড়া থেকে চতুরপার্শ্বে র্র্৬র্   ইঞ্চি করে বাদ রেখে ঐ গাছের পাতা যে পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে সে পরিমান জায়গাতে উক্ত সার প্রয়োগ করতে হবে।

৩.           উই পোকার উপদ্রপ থাকলে গাছের পাতা যতদুর পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে তারচেয়েও র্২ ফুট বেশী এলাকা পর্যন্ত জমিতে ৬ মাস পরপর প্রতি বর্গফুটের জন্য রিজেন্ট ২৫ গ্রাম প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে প্রয়োগ করতে হবে। এ সময় ভালভাবে বর্ষা না থাকলে আইল বেঁধে সেচ দিয়ে পানি বেঁধে দিতে হবে।

৪.           মাটিতে ছত্রাক ঘটিত রোগ থেকে চারা ও গাছকে রক্ষা করতে প্রতি বর্গফুটের জন্য ব্যাভিস্টিন ২৫ গ্রাম প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে গাছের গোড়া থেকে শুরু করে গাছের পাতা যতদুর পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে তারচেয়েও র্২ ফুট বেশী এলাকা পর্যন্ত জমিতে প্রয়োগ করতে হবে। এ সময় ভালভাবে বর্ষা না থাকলে সেচ দিতে হবে।

৫.           সার কম ব্যবহারে গাছ রোপন করতে চাইলে গর্ত থেকে তোলা সমস্ত মাটির সাথে “ক” অথবা “খ” অথবা “গ” অথবা “ঙ” এর যে কোন একটির বর্ণনায় উল্লেখিত সারের ৫০% মিশাতে হবে।

৬.           আম সংগ্রহের পরপরই ডালের যে অংশে পেড়ে নেয়া ফলের বোটা লেগেছিল/মুকুলের ছড়ার বোটা লেগেছিল। সেই স্থানের ৪-৮ সেমি/প্রয়োজনে তার চেয়ে বেশী নিচ থেকে ধারালো অস্ত্র/সিকেচার দিয়ে কেটে দিতে হবে। কাঁটার ঠিক পরপরই ছত্রাক নাশক ও কীটনাশক ¯েপ্র করতে হবে। সম্ভব হলে ঐ সাথে নুট্রাফস-এন ৩ গ্রাম প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে ¯েপ্র করতে হবে এবং ঐ সময়ের জন্য নিম্নে বর্ণনামত সার অতিদ্রুত প্রয়োগ করতে হবে।

৭.           গাছের বয়স এক বছর হলে এখানে উল্লেখিত যে কোন একটি গ্র“পের মোট সারের ৫০% প্রয়োগ করতে হবে। বাগানের মাটি বেঁলে হলে প্রতি বছর ২২% বাড়াতে হবে। এভাবে ১১ বছরে তা বেড়ে ২৭০% হবে। দোঁ-আশ মাটি হলে পরবর্তি বছর ১৮% বাড়াতে হবে। ১১ বছরে তা বেড়ে ২৩০% হবে। এঁটেল মাটি হলে পরবর্তি প্রতি বছর ১৪% বাড়াতে হবে। ১১ বছরে তা বেড়ে ১৯০% হবে। পরবর্তি বছরগুলোতে সারের পরিমান একই থাকবে। একটি কথা মনে রাখতে হবে গাছ যত বড় হবে তার খাদ্য তত পরিমান বেশি লাগবে এবং ফল তত বেশি দিবে। একটি গাছ যদি আপনাকে বছরে ২০০০ টাকার ফল দেয় তাকে বছরে অবশ্যই ২০০ টাকার খাদ্য খেতে দিতে হবে। এ ব্যাপারে কার্পন্য করা উচিত হবে না। যে বছর গাছে ফল কম হবে সে বছর ঐ বছরের জন্য নির্ধারিত সারের ৫০% ফল পাড়ার পরপরই এবং বাকি ৫০% সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে প্রয়োগ করতে হবে। আর যে বছর ফল বেশী হবে সে বছর কি পরিমান ফল বেশি হয়েছিল তার সঙ্গতি রেখে ঐ বছরের জন্য নির্ধারিত সারের পরিমান ১৫%-৪০% বৃদ্ধি করে তা ফল পাড়ার পরপরই দেওয়া সারের সাথে একত্রে প্রয়োগ করতে হবে। ফল পাড়ার পর দেওয়া সারে ফসফরাসের মান যা থাকবে নাইট্রোজেনের মান সেই পরিমান করতে প্রয়োজন মত নাইট্রোজেন বাড়তি প্রয়োগ করতে হবে। সার প্রয়োগের সময় বর্ষা না থাকলে সেচ দিতে হবে।

৮.           প্রধান প্রধান পুষ্টমৌল ছাড়া গাছের সুস্বাস্থ্য বেশী ফলনের জন্য অণুখাদ্যেরও প্রয়োজন। অতি অল্প মাত্রায় এর প্রয়োজন হয় বলে এই জাতীয় পুষ্টিমৌলের নাম অণুখাদ্য, আয়রন, জিঙ্ক, বোরণ, কপার, ম্যাঙ্গানিজ, মলিবডেনাম প্রভৃতি এ জাতীয় খাদ্যমৌল। এগুলি মাটিতে থাকা সত্ত্বেও জটির রাসায়নিক বিক্রিয়ার দরুন গাছের পক্ষে অনেক সময় গ্রহণযোগ্য অবস্থায় থাকে না। কাজেই গাছের এই অভাব পূরনের জন্য অণুখাদ্য ফলিয়ার ফিড, হিসেবে পাতায় স্প্রে করা উত্তম। প্রয়োজনের অতিরিক্ত প্রয়োগ করা হলে গাছে/ফলে বিষক্রিয়া দেখা দিতে পারে। এ কারণে গাছের ঐ সময়কার অবস্থার ভিত্তিতে কিকি অণুখাদ্য কতটুকু প্রয়োজন তা নির্ধারন করে তা পাতায় স্প্রে করা উচিত। 

আশফল

আশফল (Longan): Euphorbia Longona L. Stend, Sapiandiaceae পরিবারের মাঝারি আকারের চিরহরিৎ বৃক্ষ। বাংলাদেশে আশফলের তেমন আবাদনেই বললেই চলে। উচুঁ পানি দাড়ায় না, এমন যে কোন ধরণের জৈব সার যুক্ত মাটিতেই আশফল জন্মে। আশফল দেখতে অনেকটা লিচুর মতই থাকে তবে ফলের গায়ে কাটা লিচুর থেকে কম হয়। আশফলের স্বাদ অনেকটা লিচুর স্বাদের মতই।

জাত: বারি আশফল-১ ব্যতিত বাংলাদেশে তেমন কোন নির্বাচিত জাত নেই। থাইল্যান্ড থেকে মাঝে মধ্যে কিছু ফলের দোকানে বা মেলায় ভাল জাতের আশফল আসে- সেগুলোর মিষ্টি সুস্বাদু ও রসালো। বাংলাদেশের কোথাও আশফলের বাগান নেই। পুরানো  অনেক জমিদার বাড়ীর আঙ্গিনায় এবং অনেক স্থানে শুধু সখের গাছ হিসেবেই আশফল দেখা যায়। বেহালা জাতের আশফলের জাতটি এ দেশে অনেকের কাছে পরিচিত।

বংশ বিস্তার: বীজ থেকে চারা হয়। গুটি কলম, ফাটল কলম ও পার্শ্ব কলমে ও নতুন গাছ তৈরি করা যায়।

উৎপাদন পদ্ধতি ও পরিচর্যা: ১০ মিঃ দূরত্বে ৬০x৬০x৬০ সে.মি. গর্তে ১৫ কেজি জৈব সার, ৫০০ গ্রাম টিএপি মাটির সাথে মিশিয়ে গর্ত ভরে দিতে হবে। ১ বৎসর বয়সের চারা লাগানো উচিত। জুলাই আগষ্ট মাসে চারা লাগানো উত্তম। পরবর্তীতে আশফলের সার দেয়ার কোন নির্দেশনা নেই। তবে প্রতি বৎসর প্রতি গাছ ২৫ কেজি গোবর সার ৫০০ গ্রাম টিএসপি, ইউরিয়া, এএসপি প্রদান করলে গাছে ফলন বেশী হবে। আশ ফলে পোকা বা রোগের আক্রমণ তথ্য অপ্রতুল।

পুষ্টিগুণ ও ব্যবহার: লিচুর মতোই-খাওয়া যায়। লিচু থেকেও বেশি আমিষ ও স্নেহ জাতীয় পদার্থ রয়েছে। বীজে রয়েছে সাবানের মত উপাদান যা পশম পরিস্কারে ব্যবহার হয়। পাকস্থলীর রোগে পাতা ও ফল ব্যবহার করা হয়।

আতাফল/ নোনাফল

আতাফল/ নোনাফল (Bullocks heart): Annona reticulatu L., Annonaceae পরিবারভূক্ত। ছোট গাছ- আগষ্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ফল থাকে। ফল মিষ্টি তবে কিছুটা নোনা স্বাদ যুক্ত। অতিরিক্ত বিচির জন্য সকল মহলে ফলের ততটা কদর নেই। বাংলাদেশের সব অঞ্চলেই বসতবাড়ীতে দেখা যায়। বাণিজ্যিক ভাবে এর চাষের প্রাধান্য নেই। বীজ দ্বারাই বংশ বিস্তার হয়। বাগানে চাষ হয় না বললেই চলে।

পুষ্টিমান ও ব্যবহার: এ ফলে শর্করা, আমিষ, ভিটামিনএ, বি ও সি রয়েছে। পাকা ফল বাত ও পিত্ত নাশক, শিকড় পিষে খেলে আমাশয় ভালো হয়। কাচা ফল থেকে কীটনাশক তৈরী করা যায়।

গোলাপ জাম

গোলাপ জাম (Rose apple): Syzyguymm JambosL, Myrtaccae পরিবারভূক্ত চির সবুজ বৃক্ষ। ফল গোলাপের সুগন্ধ যুক্ত। জাত বাছাই, বাগানে লাগানো, পরিচর্যার ওপর কোন গবেষনা নেই। প্রায় সব ধরনের মাটিতেই জন্মে। দাড়ানো পানিসহ্য করতে পারেনা। বানিজ্যিক ভিত্তিতে এ ফলের চাষ হয় না।

বংশ বৃদ্ধি: বীজ দ্বারাই বংশ বৃদ্ধি হয়। গুটি কলমে ও হয়। মে-জুন মাসে বীজ রোপন করা হয়।

উৎপাদন: বাগানে পরিকল্পনা করে লাগাতে হলে ৮ মি. দূরত্বে ৭৫ মি. চওড়া ও গভীর গর্ত করে, ১০ কেজি গোবর, ৫০০ গ্রাম টিএসপি মাটির সাথে মিশিয়ে গর্ত ভরাট করে চারা লাগাতে হবে। ৩ মাস পর নতুন পাতা খো ুদলে ১০০ গ্রাম ইউরিয়া ও ১০০ গ্রাম এমপি সার প্রয়োগ করা যেতে পারে। সার দুই ভাগে বর্ষার প্রথমে এক বাার ও শেষে আরেক বার প্রয়োগ করতে হবে। গুটি কলমের গাছে ৩-৪ বছর বয়সে ও বীজের গাছে ৮-১০ বছর থেকে ফল ধরা শুরু হয়। প্রতি গাছে প্রায় ৩০ কেজি ফলন হয়।

পুষ্টিমান ও ব্যবহার: আমিষ, শর্করা, খনিজ লবন, ভিটামিন সি ও ভিটামিন এ সমৃদ্ধ সুস্বাদু ফল। পাকা ফলে সৈন্ধব লবন মিলিয়ে খেলে পাতলা পায়খানা বন্ধ হয়। গাছের বাকল ও পাতা ডায়বেটিক রোগের ঔষধ হিসাবে ব্যবহার হয়।

বেল

বেল (Bael): Aeglde marmelos L., Rutaceae পরিবারভূক্ত পত্রপতনশীল বৃক্ষ। ফল শক্ত খোসার আবরণে ঢাকা থাকে। বিচি আঠালো। সুস্বাদু তবে আঠার জন্য শাস খেতে অসুবিধা হয় বলে অনেকে পছন্দ করে না। গাছটি অতি ক্ষরা সহ্য করার ক্ষমতা সম্পন্ন। বাংলাদেশের সব অঞ্চলেই বসতবাড়ীতে এর অবস্থান লক্ষ্য করা যায়।

জাত: উল্লেখযোগ্য কোন জাত নেই। তবে হাজারী বেলের জাতটি অনেকের পরিচিত।

উৎপাদন পদ্ধতি: সার ব্যবস্থাপনায় সুনির্দিষ্ট সুপারিশ নেই।

পুষ্টিগুণ ও ব্যবহারঃ আমিষ, শর্করা ও ভিটামিন সি রয়েছে। পাঁকা ফলের বিতরের অংশে সুস্বাদু, মিষ্টি। সরবত করে খাওয়া চলে। কাচা ফল ডাইরিয়ার ঔষধ হিসাবে ও পাতার রস জন্ডিসের ঔষধ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। পাকা বেল কোষ্ঠকাঠিন্য দুর করে ও আমাশয়ের ঔষধ হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

বাতাবি লেবু

বাতাবি লেবু (Pumelo): Cirtus grandis, Rutaccae পরিবারভুক্ত মাঝারি আকারের বৃক্ষ। বাংলাদেশের সব অঞ্চলেই বসত বাড়ীতে এ গাছ দেখা যায়। সাইট্রাস ফলের মধ্যে সবচেয়ে বড় ফল-বাতাবি বা জাম্বুরা। বাংলাদেশের সব অঞ্চলেই বাতাবি লেবু দেখা যায়। কিছুটা অম্লীয় উচুঁ ও নিষ্কাশন যোগ্য হালকা দোয়াশ ও পলি দোয়াশ মাটিতে ভাল হয়।

জাত: বারি-১ ও বারি-২ নামের দুটি বাতাবি লেবুর জাত বাংলাদেশ কৃষি গবেষনা ইনস্টিটিউ কর্তৃক অনুমোদন পেয়েছে। এ দুটি জাতেই মাঝারি আকারের ফল হয়। ফলের খোসা পাতলা, কোয়ার রং সাদা ও গোলাপির মাঝামাঝি, স্বাদ মিষ্টি ও বেশ রাসালো।

বংশ বিস্তার : বীজের সাহায্যে বংশ বিস্তার করলে- জাত সঠিক থাকে না।ঞ বাড়ি এর মাধ্যমে বংশ বিস্তার উত্তম। ফাটল কলমেও বংশ বিস্তার সহজ। ভাল জাতের সায়ন সংগ্রহ করে যে কোন ধরনের বাতাবি রুট স্টকের উপর কলম করা চলে।

উৎপাদন পদ্ধতি: বাগানে পরিকল্পিত ভাবে এ ফলটি চাষ করার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। ইত্যেমধ্যে ছোট আকারের দু একটি বাগান তৈরি ও হয়েছে। বাগানে ৫ x ৫ মি. দূরত্বে ৫০ সে.মি. চওড়া ও গভীর গর্ত করে প্রতি গর্তে ১৫ কেজি জৈব সার, ৫০০ গ্রাম খৈল, ১০০ গ্রাম টিএসপি মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। ১০-১২ মাস বয়সের কলম করা চারা গর্তে লাগাতে হয়। বীজ থেকে উৎপন্ন চারা কলম করতে হলে গর্তে বীজ লাগানোর ১০-১২ মাস পর সরাসরি বাগানেই কলম করা চলে। প্রথম বার সার প্রদানের ৩মাস পর আবার সমপরিমান ইউরিয়া ও এমপি সার প্রধান করতে হবে। তিন বৎসর থেকে রাসায়নিক সার প্রতি বৎসর ৫০ গ্রাম করে বৃদ্ধি করে ১০ বৎসর বয়সে প্রতি গাছে টি এস পি ৫০০ গ্রাম, ইউরিয়া ৬৫০ গ্রাম ও এমপি ৬৫০ গ্রাম বর্ষার আগে ও বর্ষার পরে দুই বারে প্রদান করতে হবে। এছাড়া বড় গাছে ৫০০ গ্রাম ডোলো চুন, ১৫ গ্রাম জিঙ্ক সালফেট ও ২০ গ্রাম বোরক্স ব্যবহার করলে বাল ফল পাওয়া যায়।

বীজ লাগাতে হয় আগষ্ট-অক্টোবরে। ফসল পাওয়া যাবে পরের বৎসর জুলাই-সেপ্টেম্বরে। প্রথম ফল আসতে ৪ বছর সময়ের প্রয়োজন হয়। ফেব্র“য়ারি- মার্চ মাসে সাধারনত ফুল আসে এবং জুলাই-সেপ্টেম্বরে ফল পাওযা যায়। কোন কোন গাছে বছরের সব সময়ই কিছু ফুল ও কিছু ফল থাকে।

পোকা মাকড় ও রোগ বালাই:

লিফ মাইনার: পাতার রস চুষে খায়। ২ মিলি/ লিটার পানির সাথে মিশিয়ে ব্যবহার করা যায়।

ফ্রুট ফ্লাই: ফলে ছিদ্র করে ডিম পাড়ে। বিষ টোপ ব্যবহার করা উত্তম। মেলা থিয়ন/ পাফেকশিয়ন ২ মি.লি,/ লি পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করা যায়।

স্টেম বোরার: ডালে গর্ত করে ছিদ্র করে। তার বেকিয়ে পোকা বের করে, গর্তে আলকাতরা ঢুকিয়ে মুখ বন্ধ করে দিতে হয়।

আগমড়া (ডাইব্যাক): বোর্দা মিকচার, অথবা কপার অক্সি ক্লোরাইড ১৫ দিন পর ছিটাতে হয়।

গামোসিস: ডাল ফেটে আঠা বের হতে থাকে। বোর্দো মিকচার ১% ব্যবহারে কিছু ফল পাওয়া যায়।

গ্রিনিং: মাইকো প্লাসমার আক্রমনে এটা হয়। পাতার সাদা সাদা দাগ পড়ে, মনে হয় দস্তার ঘাটতি হয়েছে। সাইলাইড, এফিড ইত্যাদি পোকা এ রোগ ছড়ায়। পোকা দমন করে রোগ বিস্তার রোধ করা যায়।

ফল সংগ্রহ ও ফলন: প্রতি গাছে ৪০-৫০ টি ফল ধরে। কিছুটা হলদে হয়ে উঠলে আগষ্ট-অক্টোবরে ফল সংগ্রহ করা যায়।

পুষ্টিমান ও ব্যবহার: শর্করা, ভিটামিন সি, পেকটিন সমৃদ্ধ ফল। তাজা ফল খেতে সুস্বাদু, ফলের রস সুপেয় ও পুষ্টি সমৃদ্ধ। ফলের খোসা থেকে উচু মানের সাইট্রাস তেল পাওয়া যায়।

কলা

কলা বাংলাদেশের একটি জনপ্রিয় ফল। অন্যান্য ফলের তুলনায় এটি সস্তা এবং সারাবছরই পাওয়া যায়। বাংলাদেশের প্রায় সর্বত্রই কলার চাষ হয়। আহারোপযোগী কাঁচা এবং পাকা কলায় আমিষ, শর্করা, চর্বি, খনিজ লবণ, ক্যালসিয়াম, লৌহ উপাদান, ভিটামিন এবং পর্যাপ্ত খাদ্যশক্তি রয়েছে। রোগীর পথ্য হিসেবে কলার ব্যাপক চহিদা আছে। কলার থোড়/ মোচা ডায়াবেটিস, আমাশয়, আলসার, পেটের পীড়ায় কাজ করে।

জাত

বিশেষজ্ঞদের মতে বাংলাদেশের প্রায় ৪০-৫০ জাতের কলার চাষ হয়ে থাকে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো- অমৃত সাগর, সবরী, কবরী, চাঁপা, সিঙ্গাপুরী বা কাবুলী, মেহের সাগর, এঁটে বা বিচি কলা, কাঁচকলা বা আনাজি কলা এবং জাহাজীকলা। তবে বারিকলা-১, বারিকলা-২ ও বারিকলা-৩ নামে তিনটি উন্নত জাত চাষের জন্য অবমুক্ত করা হয়েছে। এরমধ্যে বারিকলা-২ জাতটি কাঁচকলার।

চারা নির্বাচন

কলার চারা বা সাকার দুই রকমের । অসি চারা ও পানি চারা। অস চারার পাতা চিকন, গোড়ার দিকে মোটা ও গোলাকার। পানি চারার পাতা রোপণের জন্য ভালো নয়। এক্ষেত্রে অসি চারা লাগানোই উত্তম।

মাটি ও জলবায়ু

পর্যাপ্ত রস থাকলে প্রায় সব ধরনের মাটিতেই কলার চাষ করা যায়। তবে পানি সেচ ও নিকাশের ব্যবস্থাযুক্ত দো-আঁশ এবং বেলে দো-আঁশ মাটি কলা চাষের জন্য ভালো। এছাড়া জমি পর্যাপ্ত আলো বাতাসপূর্ণ হওয়া দরকার। অতিবৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি এবং কালবৈশাখী ঝড় কলা চাষের ক্ষতি করে থাকে। অপরদিকে শীতকালে এবং প্রচুর আর্দ্রতাযুক্ত জলবায়ুতে (৮৬%) কলা গাছের বৃদ্ধি ভালো হয়।

চারা রোপণ

ভাদ্র মাস ছাড়া যে কোনো মাসেই চারা রোপণ করা যায়। তবে চারা রোপণের উপযুক্ত সময় হলো আশ্বিনের মাঝামাঝি থেকে অগ্রহায়ণের মাঝামাঝি এবং মাঘের মাঝামাঝি থেকে চৈত্রের মাঝামাঝি। তিন মাস বয়সী সুস্থ সবল অসি চারা লাগানো উচিত।

চারা রোপণের পূর্বে ৫০ সেমি. গভীর করে মাদা তৈরি করতে হবে। একমাদা থেকে অপর মাদা বা এক চারা থেকে অপর চারার দূরত্ব রাখতে হবে ২.০০ মি. (৬ফুট) রোপণের সময় চারার গোড়ার কাটা অংশটি দক্ষিণ দিকে ফেলতে হবে যাতে পরে কাদিটি উত্তরদিকে বের হয়।

সারের পরিমাণ ও প্রয়োগ পদ্ধতি

সারের নাম                           পরিমাণ

গোবর/ আবর্জনা সার      ১৫-২০ কেজি

টিএসপি                                ২৫০-৪০০ গ্রাম

এমপি                                      ২৫০-৩০০ গ্রাম

ইউরিয়া                         ৫০০-৬৫০ গ্রাম

গোবর সারের অর্ধেক জমি তৈরির সময় এবং বাকি অর্ধেক গর্তে দিতে হবে। এ সময় অর্ধেক টিএসপিও গর্তে প্রয়োগ করা দরকার। রোপণের দেড় থেকে দুই মাস পর ১/৪ ভাগ ইউরিয়া, ১/২ ভাগ এমপি ও বাকি অর্ধেক টিএসপি সার গাছের গোড়ার চারিদিকে মাটি কুপিয়ে ছিটিয়ে দিতে হবে। এর দুই থেকে আড়াই মাস পর গাছ প্রতি বাকি অর্ধেক এমপি ও অর্ধেক ইউরিয়া একইভাবে প্রয়োগ করতে হবে। ফল আসার সময় অবশিষ্ট ১/৪ ভাগ ইউরিয়া জমিতে ছিটিয়ে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে হবে।

অন্তর্বর্তীকালীন পরিচর্যা

আগাছা দমনঃ কলার ভালো ফলন পেতে হলে জমিতে আগাছা দেখা মাত্রই তুলে ফেলা দরকার। আগাছা দমন, সার দেয়া ও মাটির সঙ্গে মিশানো এসব কাজগুলো এক সঙ্গে করা যেতে পারে।

অতিরিক্ত চারা কাটাঃ কলাগাছের গোড়া হতে নতুন সাকার বা চারা বের হয়ে থাকে। কলার ছড়া বের হওয়ার আগ পর্যন্ত কলা গাছে নতুন চারা কোনো অবস্থাতেই রাখা উচিত নয়। সাধারণত দু-এক মাস পর পর এসব চারা মাটি সমান করে কাটা দরকার।

সেচ প্রদান ও পানি নিষ্কাশন

কলা গাছে প্রচুর পানির প্রয়োজন হয়। কিন্তু গাছ অতিরিক্ত পানি সহ্য করতে পারে না। বিশেষ করে দাঁড়ানো পানি। তাই পানি যাতে না দাঁড়ায় সেজন্য নিষ্কাশন নালা এবং শুকনো মৌসুমে সেচ নালা তৈরি করে তা দিয়ে দু-একবার সেচ দিতে হবে।

খুঁটি দেয়া

কলা গাছে ছড়া আসার পর বাতাসে গাছ ভেঙে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে বাঁশ বা গাছের ডাল দিয়ে খুঁটি বেঁধে দিলে ছড়া ভেঙে পড়া রোধ হয়।

অন্তর্বর্তী ফসল

কলাবাগানে অন্তর্বর্তী ফসল হিসেবে মুলা, পালংশাক, মরিচ, ছোলা, মসুর, বরবটি, বাঁধাকপি, লালশাক, ডাঁটাশাক এসব ফসলের চাষ করা যেতে পারে। তবে এসব ফসলেরর জন্যে আলাদাভাবে সার প্রয়োগ করতে হবে।

পোকামাকড় দমন

কলা গাছ ফল ও পাতার বিটল পোকা, রাইজোম উইভিল, থ্রিপস এসব পোকা দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে। বিটল পোকা ফল ও পাতায় আক্রমণ করে। আক্রান্ত ফলে কালো গোল ও লম্বা দাগ দেখা যায়। ফল ছোট হয় এবং বাজারে দাম কমে যায়। উইভিল পোকা কলার কন্দে ছিদ্র করে প্রবেশ করে ও নরম অংশ খেয়ে ফেলে। আক্রান্ত অংশ পচে যায় ও পরে গাছ মরে যায়। থ্রিপস সাধারণত কলার খোসায় আক্রমণ করে এবং খোসার উপরে ছোট ছোট বাদামি লম্বা দাগ দেখা যায়।

দমন

২০ মিলিলিটার ডায়াজিনন ৬০ ইসি ১০ লিটার পানির সঙ্গে মিশিয়ে ১০/১৫ দিন অন্তর অন্তর কয়েকবার ¯েপ্র করে এসব পোকা দমন করা যেতে পারে।

রোগ বালাই

কলার প্রধান তিনটি রোগ হচ্ছে-

(১)          পানামা রোগে (২) সিগাটোকা (৩) গুচ্ছ মাথা রোগ।

নিম্নে  সংক্ষেপে এদের বর্ণনা দেয়া হলো।

পানাম রোগ:

এ রোগের আক্রমণে গাছের পাতা হলদে দেখায়। পাতা ঁেবাটার কাছে ঝুলে যায় এবং কাণ্ড অনেক সময় ফেটে যায়। আক্রান্ত গাছ আস্তে আস্তে মরে যায় অথবা ফুল ও ফল ধরে না। রোগের পতিকার হিসেবে রোগমুক্ত গাছ লাগাতে হবে, রোক্রান্ত গাছ তুলে ফেলে দিতে হবে কিংবা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পন্ন জাতের চাষ করতে হবে। এছাড়া টিল্ট- ২৫০ ইসি (০.০৪%) ছত্রাকনাশক অনুমোদিত মাত্রায় আক্রান্ত গাছে প্রয়োগ করেও সুফল পাওয়া যেতে পারে।

সিগাটোকা রোগ:

এ রোগের আক্রমণে পাতার উপর গোলাকার বা ডিম্বাকৃতির গাঢ় বাদামি রঙের দাগ পড়ে। ব্যাপক ভাবে আক্রান্ত হলে পাতা ঝলসে যায় ও দূর থেকে সমস্ত গাছের পাতা আগুনে ঝলসে গেছে বলে মনে হয়ে। ফল ছোট আকারের হয় এবং গাছের ফলন বহুলাংশে কমে যায়। এ রোগের প্রতিকার হিসেবে আক্রান্ত গাছের পাতা পুড়িয়ে ফেলতে হবে। তাছাড়া টিল্ট-২৫০ ইসি প্রতি১০ লিটার পানিতে ৫ মি.লি. হারে মিশিয়ে ১৫-২০ দিন পর পর স্প্রে করে রোগ দমন করা যেতে পারে।

গুচ্ছমাথা রোগ:

এ রোগে আক্রান্ত গাছের পাতা সরু এবং ফ্যাকাসে রঙের হয়। ফলে অনেকগুলো পাতা গুচ্ছ আকারে খাড়া অবস্থায় থাকে। এটি একটি ভাইরাসজনিত রোগ। জাব পোকার মাধ্যমে এ রোগ ছড়ায়। ম্যালাথিয়ান বা অন্য যে কোনো অনুমোদিত কীটনাশক প্রয়োগে জাব পোকা দমনের মাধ্যমে এ রোগের প্রকোপ কমানো যায়। তাছাড়া রোগমুক্ত এবং রোগ সহনশীল জাতের সাকার চাষ করেও এ রোগের হাত থেকে বাঁচা যায়। রোগাক্রান্ত গাছ দেখামাত্র উঠিয়ে ধ্বংস করে ফেলতে হবে। এ ছাড়াও যে কোনো সমস্যা বা পরামর্শেও জন্য স্থানীয কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের সহায়তা নেয়া যেতে পারে।

কলার রোগ ও প্রতিকার

পানামা রোগ:

লক্ষণ:

কলার পানামা রোগ একটি ছত্রাক জাতীয় মারাত্মক রোগ। এ রোগের লক্ষণ সমূহ নিম্নরুপ:

১। প্রথমে বয়স্ক পাতার কিনারা হলুদ হয়ে যায়। পরবর্তীতে কচি পাতাও হলুদ রঙ ধারণ করে।

২। পরবর্তীতে পাতা বোটার কাছে ভেঙ্গে চারদিকে ঝুলে থাকে এবং মরে যায়।

৩। সবচেয়ে কচি পাতাটি গাছের মাথায় খাড়া হয়ে দাড়িয়ে থাকে।

৪। অনেক সময় গাছ লম্বালম্বিভাবে ফেটেও যায় এবং সবশেষে গাছ মারা যায়।

প্রতিকার:

১। আক্রান্ত গাছ গোড়াসহ উঠিয়ে পুড়ে ফেলতে হবে।

২। আক্রান্ত গাছের সাকার (তেউর) চারা হিসাবে ব্যবহার করা যাবে না।

সিগাটোকা রোগ

লক্ষণ :

এ রোগের আক্রমনে

১। প্রাথমিকভাবে গাছের তৃতীয় ও চতুর্থ পাতায় ছোট ছোট হলুদ দাগ দেখা যায়।

২। ক্রমশ দাগগুলো বড় হয় ও বাদামী রং ধারণ করে। এভাবে একাধিক দাগ মিলে বড় দাগের সৃষ্টি করে। এ সময় পাতা পুড়ে যাওয়ার মতো দেখা যায়।

প্রতিকার:

১। আক্রান্ত গাছের পাতা পুড়ে ফেলতে হবে।

২। প্রতি লিটার পানিতে টেবুকোনাজল বা প্রপিকোনাজল (যেমন; ফলিকুর ইডব্লিউ ২৫০) ১ মিলি হারে এবং এনট্রাকল ৪ গ্রাম একসাথে মিশিয়ে ৭ থেকে ১০ দিন পর পর ¯েপ্র করতে হবে।

বানচি টপ ভাইরাস রোগ

লক্ষণ:

ভাইরাস বাহক জীবাণুর কারণে এ রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। এ রোগের আক্রমনে

১। গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি কমে যায় ও পাতা গুচ্ছাকারে বের হয়।

২। পাতা আকারে খাটো, অপ্রশস্থ এবং উপরের দিকে খাড়া থাকে।

৩। কচি পাতার কিনারা উপরের দিকে বাঁকানো এবং সামান্য হলুদ রঙের হয়।

৪। অনেক সময় পাতার মধ্য শিরা ও বোটায় ঘন সবুজ দাগ দেখা যায়।

প্রতিকার:

১। আক্রান্ত গাছ গোড়াসহ উঠিয়ে পুড়ে ফেলতে হবে।

২। ভাইরাস বহনকারী পোকা ( জাব পোকা, এফিড, থ্রিপস) দমনের জন্য

 ইমিডাক্লোপ্রিড (যেমন; এডমায়ার, ইমিটাফ) ১০ লিটার পানিতে ৫মিলি হারে মিশিয়ে ¯েপ্র করতে হবে।

বিটল পোকা

লক্ষণ:

১। কলার পাতা ও ফলের বিটল পোকা কলার কচি পাতায় হাটাহাটি করে ও সবুজ অংশ খেয়ে নষ্ট করে ফেলে। ফলে সেখানে অসংখ্য দাগের সৃষ্টি হয়।

২। কলা বের হওয়ার সময় হলে পোকা মোচার মধ্যে ডুকে কচি কলার উপর হাটাহাটি করে ও রস চুষে খায়। ফলে কলার গায়ে বসন্ত রোগের দাগের মত দাগ হয়।

প্রতিকার:

১। পোকা আত্রান্ত মাঠে বার বার কলা চাষ করা যাবে না।

২। কলার মোচা বের হবার সময় ছিদ্র বিশিষ্ঠ পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার করতে হবে।

৩। প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম সেভিন ৮৫ ডব্লিউ পি মিশিয়ে ১৫ দিন পর পর ২ বার গাছের পাতায় ছিটাতে হবে। এছাড়াও ম্যালাথিয়ন বা ডায়াজিনন জাতীয় কীটনাশক প্রতি লিটারে ২ মিলি হাওে মিশিয়ে ¯েপ্র করলেও এ পোকার আক্রমন নিয়ন্ত্রন করা যায়।

গোবরে পোকা

এছাড়া চারা গাছের গোবরে পোকার আক্রমন রোধ করতে প্রতিটি গাছের মধ্য পাতা বরাবর ১ চা চামচ করে কার্বোফুরান ৫জি ( যেমন; কুরাটার) ব্যবহার করলে ভালো ফল পাওয়া যায়।

ফুল ফল ঝরা রোধে করনীয়:

কলার ফুল ফল ঝরা রোধে হরমোন জাতীয় ওষধ (যেমন; প্লানোফিক্স, ১০ লিটার পানিতে ৪ মিলি হারে মিশিয়ে) মোচা কাটার ১ মাস পর ১ বার এবং প্রথম ¯েপ্ররও ১৫ থেকে ২০ দিন পর ২য় বার ¯েপ্র করতে হবে।

বাউকুল

কুল বাংলাদেশের একটি উৎকৃষ্ট ফল। বাংলাদেশের সব জেলাতেই কুলের চাষ হয়। তবে ঢাকা, গাজীপুর, ময়মনসিংহ রাজশাহী, রংপুর, দিনাজপুর, নওগাঁ, নাটোর, খুলনা, সাতক্ষিরা, যশোর,  কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, বরিশাল,  চট্টগ্রাম, পার্বত্যঅঞ্চল ও কুমিল্লায় উন্নত জাতের কুল বেশী পরিমানে উৎপন্ন হয়। কুল মূলত বসন্ত কালীন সবজী। কিন্তু বাউকুল শীতের শুরু থেকে বসন্তের মাঝামাঝি সময় বেশি পাওয়া যায়। এছাড়া বর্ষাকালেও বাউকুল উৎপাদন হয়। অধিক বৃষ্টির কারনে ঐ সময়টায় কুলের মিষ্টান্নের পরিমান কম থাকে।কুল সাধারণত পাকা ও টাটকা অবস্থায় খাওয়া যায়। কুলের জাত ও পরিপক্ষতা বিচারে এর খাদ্য মানের যথেষ্ট্য তারতম্য দেখা যায়। কুল শুকিয়ে পরবর্তীতে ব্যবহারের জন্য ঘরে রেখে দেওয়া যায়কুল দিয়ে মুখ রোচক চাটনী, আচার, মোরব্বা, শরবত ও জেলি করা যায়। কুল গাছ এক প্রকার অতি ক্ষুদ্র পোকা পালন করে যা দিয়ে গালা (লাক্ষা) তৈরী করা যায়।

গত বছর ময়মনসিংহস্থ বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্মপ্লাজম সেন্টর থেকে, বাংলাদেশ এগ্রিকালচার ইউনিভার্সিটি (ইঅট) কুল” বা সংক্ষেপে ’বাউকুল’ নামে একটি উচ্চ ফলনশীল কুলের জাত উদ্ভাবন হয়েছে। এ কুলের উদ্ভাবক এবং জার্মপ্লাজম সেন্টারের ফল উন্নয়ন প্রকল্প পরিচালক প্রফেসর ড. এম এ রহিম। এ কুলের উদ্ভাবন সম্পর্কে বলেন-“বিশ্বের কয়েকটি দেশ মালয়েশিয়া, ইংল্যান্ড, কাতার, দোবাই, কেনিয়া, ব্রাজিল, মায়ানমার, থাইল্যান্ড, তাইওয়ান, রাশিয়া ইত্যাদি দেশ থেকে বিভিন্ন ফলের জাত সংগ্রহ করে জার্ম প্লাজম সেন্টারে গবেষণা করা হয়। বাউকুলের ক্ষেত্রে বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত ও আকারে বড় পুষ্টিমানের দিক থেকে বেশি থাইকুল ও তাইওয়ানকুলসহ দেশি বিদেশি প্রায় ৩০ জাতের গাছ জার্মপ্লাজম সেন্টারে রোপন করে গবেষনা করা হয় ২০০৪ সালে ন্যাচারল ক্রসের মাধ্যমে এই জাতটি দেখতে যায়। তখন সেখান থেকে এই জাতটি সিলেক্ট বা নির্ধারন করা হয় এবং আমার নিজের গবেষণা প্লটে তিন বছর চাষাবাদ করি তার পর ২০০৬ সালে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চাষাবাদের জন্য অবমুক্ত করি। কৃষকের মাঠে পাঠানোর আগে আমাকে অনেক কিছু পরীক্ষা নিরিক্ষা করতে হয়। আমাদের আবহাওয়া, আমাদের জলবায়ু, আমাদের মাটির গুণাগুণ এই কুলের জন্য যথেষ্ট কিনা ? কৃষকরা কোন ভাবে ক্ষতির সম্মুখিন হবে কিনা,এই গাছের কি ধরনের রোগ ব্যাধি হয়? রোগ ব্যাধি দেখা দিলে কি ওষুধ প্রয়োগ করতে হবে। কোন ধরনের পোকা মাকড়ের আক্রমণ হয়? পোকা মাকড়ের আক্রমণ হলে কি ওষুধ দিলে উপশম হবে। এ সব বিষয়েও আমাকে পরীক্ষা নিরিক্ষা করতে হয়। আরো বিশেষভাবে নজর দিতে হয় এই গাছে কি ধরনের সার দিতে হবে, রাসায়নিক সার না দিয়ে জৈব সার দিলে গাছের কত উপকার হবে। ফলের মিষ্টতা বাড়বে কিনা? গাছে সেচ দিতে হবে কিনা তা দিতে হলে কোন সময় কি পরিমান সেচ দিতে হবে। নানাদিক পরীক্ষা নিরিক্ষা শেষে আমি এই বাউকুল কৃষকদের মাঝে চাষের জন্য দিই। প্রথম বছরেই কৃষকরা সাফল্য পায়। ইনভেস্ট উঠে আসে। কৃষকরা লাভবান হচ্ছে। আমি বাউকুল চাষিদের আশ্বাস্থ করতে চাই এই বলে যে, আগামি ১০ বছরের মধ্যে বাউকুলে ফলন, মিষ্টতা, পুষ্টিগুণাগুণ মানের দিক থেকে কোনভাবে ক্ষুন্ন হবেনা। একটু যত্ন নিলে কৃষকরা লাভবান হবেন। পাশাপাশী ভোক্তারাও একটি পুষ্টিসমৃদ্ধ ফল খেতে পাবেন। প্রচুর টাকা ব্যায় করে বিদেশ থেকে আপেল আমদানি করে আনতে হয়। আপেলের চেয়ে বাউকুলের পুষ্টিগুণাগুণ অনেক বেশি। আমি বাঙ্গালীর নাস্তার টেবিলে আপেলের পরিবর্তে বাউকুল দেখতে চাই।”

বাউকুলের বৈশিষ্ট্যঃ

১.            বিশাল আকৃতির ফল সাধারণত একটি কুলের ওজন ১০০ গ্রাম হয়।স্বাভাবিকভাবে ৮ থেকে ১২টিতে এক কেজি হয়।  তবে সর্বোচ্চ রেকর্ডকৃত ওজন ২৫০ গ্রাম পাবনার ঈশ্বরদির ময়েজের খামারে ২৫০ গ্রাম পর্যন্ত হয়েছে।

২.           বীজ ছোট। গায়ের মাংস বা ভক্ষণযোগ্য অংশ ৯৫ ভাগ।

৩.           ফল ডিম্বাকার, দৈর্ঘ্য ২ থেকে ২.৫০ ইঞ্চি। ব্যাস- ২ থেকে ২.২৫ ইঞ্চি। বিচি আকারে খুবই ছোট ৩-৪ গ্রাম হয়।

৪.           সুমিষ্ট, সুস্বাদু, রসালো, কচকচে ও কষহীন।

৫.           বাউকুল টব এবং অর্ধড্রামে সফল চাষ করা যায়।

৬.           কলমের মাধ্যমে তৈরীকৃত গাছে প্রথম বছরেই ফল পাওয়া যায়।

৭.           গাছে আঙ্গুরের মত থলি থলি ধরতে দেখা যাচ্ছে। গাছের পাতার গোড়া থেকে ফল ধরে।

৮.           অপেক্ষাকৃত বোটা শক্ত তাই ডাল ভেঙ্গে গেলেও সহজে ফল ঝরে  পড়ে না।

৯.           সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে মুকুল আসে ও জানুয়ারী-ফেব্র“য়ারী-মার্চে ফল আহরণ করা যায়।

বিভিন্ন খনিজ দ্রব্য এবং ভিটামিন এ ও সি সমৃদ্ধ। অতি মিষ্টি রসালো এবং ১০/১২টিতে এক কেজি পরিমান হয়। আপেল আকৃতির এ কুলের বাণিজ্যিক চাষ শুরু হয়েছে। উদ্ভাবক এ কুলটিকে আপেলের সাথে তুলনা করে আপেলের চেয়ে পুষ্টিগুণাগুনের দিক থেকে কয়েকগুণ বেশি বলে মনে করেন। বাউকুল বিশ্বের উন্নতজাতের কুল থেকে ১৭বছর যাবৎ গবেষনা করে জাতটি উদ্ভাবন হয়।

বিদেশ থেকে আমদানীকৃত আপেল ও বাউকুলের তুলনামূলক পুষ্টিগুণাগুণ নিম্নরূপ ঃ

প্রতি ১০০ গ্রাম ফলে আছে                              আপেল                                বাউকুল

প্রোটিন                   ০.০৩ গ্রাম           ৭.০৩ গ্রাম

কার্বোহাইড্রেড    ১১.০৮ গ্রাম        ৮৪.০০ গ্রাম

ভিটামিন-সি                        ১০.১২ মি গ্রা                      ১৫০-৩০০ মি.গ্রা

ভিটামিন-এ         ০.৪৫ মি গ্রা         ১২৫.০০ মি.গ্রা

আয়রন                 ০.৪৮ মি গ্রা         ৩.৫০ মি.গ্রা

ক্যালসিয়াম                        ৭.০০ মি গ্রা         ১৩০.০০ মি.গ্রা

পটাশিয়াম                                           ১৪৫.০০ মি গ্রা                   ১০৫০.০০ মি.গ্রা

সোডিয়াম                                             ৩.০০ মি গ্রা         ১২.০০ মি.গ্রা

ফসফরাস                            ১২.০০ মি গ্রা      ১৬৮.০০ মি.গ্রা

জলবায়ূ, মাটি ও রোপন:

কুল অত্যন্ত কষ্টসহিষ্ণু এবং এর পরিবেশিক উপযোগিতা খুবই ব্যাপক। সাধারণত শুষ্ক ও উষ্ণ জলবায়ূ কুল চাষের জন্য সর্বোত্তম। এতে কুরের ফলন ও গুনাগুন দুইই ভাল হয়। তবে অতিরিক্ত আর্দ্রতা কুল চাষের জন্য ভাল নয়। বাউ-কুল সারা বছরই লাগানো যায়। তবে বর্ষাশৌসুমে লাগানো উত্তম। গভীর দোঁআশ বা উর্বর মাটি কুল চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। জমি ভাল ভাবে চাষ করে বাউ-কুল এর জন্য ৩মি. ঢ ৩ মি. দুরে দুরে ৩০ সেন্টিমিটার গর্ত করতে হয়। সবধরনের মাটিতে এই বাউকুল গাছ ভাল হয়। যে মাটিতে লবনের পরিমান বেশি সে মাটিতেও বাউকুল চাষাবাদ হবে এবং মাটির লবনাক্ততা কমে যাবে। লোনা মাটির পিএইচ ৯.৫ এর উপরে থাকলে সেক্ষেত্রে চারা লাগানোর গর্তে ৭-১০ দিন আগে জিপসাম সার প্রয়োগ করতে হবে।

গর্ত যেমন হবে:

বৃত্তাকার ২-৩ ফুট, গভীরতা ২ ফুট।

রোপানের দুরত্ব:

মাটির উর্বরতা, জাত এবং ডাল ছাটাইয়ের ধরনের উপর গাছ রোপনের দুরত্ব নির্ধারণ করতে হয়ে। যেমন-১২ঢ১২, ১০ঢ১০, ৮ঢ৮, ৬ঢ৬ রেপান করা যায়।

রোপনের প্রাথমিক ধারনা:

১.            রোপনের ১০-১৫ দিনে আগে গর্ত থেকে তোরা মাটির সাথে গোবর সার ১৫-৫০ কেজি টিএসপি ২০০গ্রাম ইউরিয়া ১০০ গ্রাম মিউরেট অব পটাশ(এমওপি) ৫০ গ্রাম, এবং জীপসাম ৫০-১০০ গ্রাম মিশিয়ে ঐ মাটি দিয়ে হগর্ত ভরে পানি দিয়ে ভাল ভাবে বসিয়ে দিতে হবে।

২.           মাটিতে উইপোকা, কাটুই পোকা, পিঁপড়া থাকলে  উপরের বর্ণনামত গর্তের মাটি পানি দিয়ে বসানোর পূর্বে গর্তের উপরের মাটিতে রিজেন্ট (দানা) ছিটিয়ে ভালভাবে মিশিয়ে দিতে হবে।

৩.           চারা বিকালের লাগানো বাল। ছায়া বা মেঘলা দিনে যে কোন সময় লাগানো যায়।

৪.           প্যাকেট থাকাকালে চারার যতটুকু অংশ মাটির প্যাকেটের ভিতর ছিল গাছ রাগাবার সময় গর্তে তার চেয়ে ২-৩ সেন্টিমিটার বেশি পুততে পবে।

৫.           গর্তের মাঝকানে চারা বসিয়ে গুলের মাটি ও গর্তের মাটির মধ্যেকার ফাঁকা  স্থানে গুড়া মাটি দিয়ে আঙ্গুলের সাহায্যে তা নিচে চেপে ফাঁকা স্থান ভরতে হবে। যেন গুলের মাটি না ভাঙ্গে অথচ গুলের মাটির সাথে গর্তের মাটি ভাল ভাবে মিশে যায়।

৬.           চারা লাগানোর পর সকল পাতা ও ডাল ঝরনার সাহায্যে পানি ঢেলে ধুয়ে দিতে হবে এবং গোড়ায় পানি দিতে হবে।

৭.           লাগানো চারার পাশে বাঁশ বা শক্ত কাটি পুতে তার সাথে বেঁধে দিতে হবে যাতে বাতাসে গাছ ঢলে পড়া বা গোড়া নড়ে না যায়।

৮.           গাছ যদি কলম হয় সেক্ষেত্রে গাছ রোপনের পর কলমের জোড়ার নিচের অংশে কুশি বের হলে সঙ্গে সঙ্গে তা কেটে দিতে হবে। মনে রাখতে হবে যে কোন কলমের চারার জোড়ার নিচের অংশ জংলী প্রজাতির হয়।

৯.           কুল গাছ একই জাতের মধ্যে এবং নিজে নিজে  ভালমত পরাগায়ন করে না। একই বাগানে একাধিক জাতের কুলগাছ  থাকলে পরাগায়ন ভাল হয়। পরাগায়নে মৌমাছি, মাছি, বুল্লা বিশেষ ভুমিকা রাখে।

১০.        গাছে ফুল তাকা অবস্থায় সেচ দিলে ফুল ঝরে যাবে। সে ক্ষেত্রে গাছের গোড়ায় সেচ দিতে হবে।

১১.         ফল পাকার পূবে বেশি বেশি সেচ দিলে ফল পাকতে দেরি করবে এবং ফল মিষ্টি কম হবে।

১২.        বাগানে ঘাস থাকলে গাছে ফুল ও ফল কম ধরবে এবং ফল তুলনামূলক ছোট হবে।

বাউকুল গাছের বৈশিষ্ট্য নিম্নরূপ:

১.            বাউকুল গাছ দ্রুত বর্ধনশীল। জুন-জুলাই মাসে এক দেড় ফুট লম্বা গাছ রোপন করলে ছয় মাসের মাথায় গাছ বৃদ্ধি পেয়ে ৫ থেকে ১০ ফুট উচ্চতায় পৌছাতে পারে এবং ছয় মাস পরেই গাছে ফল আসে। ৫ থেকে ১৫ কেজি পযৃন্ত ফল আসতে দেখা গেছে।

২.           বাউকুল গাছ মাটিকে সংরক্ষণ করে।

৩.           বাউকুল গাছ বর্ষাকালে মরে যায় না বরং বাউকুল পাওয়া যায়।

৪.           প্রতি বছর বাউকুল গাছ থেকে কুল পাওয়ার পর গরম আবহাওয়া শুরু হলে ডালপালা কেটে দিতে হয় সেক্ষেত্রে জ্বালানী কাঠ পাওয়া যায়।

৫.           বাউকুল কাঁচা খাওয়া যায়। আবার আচার, জ্যাম, জেলি বানিয়েও দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করে খাওয়া যায়।

৬.           বাউকুল গাছে পরিপক্ক হলে গাছ থেকে সংগ্রহ করতে হবে। কোনভাবে অপরিপক্ক বাউকুল গাছ থেকে সংগ্রহ করা যাবে না। মনে রাখতে হবে বাউকুল গাছ থেকে ছেড়ার পর পাকে না, শুকিয়ে কুচকে নরম হয়ে যায়। এতে বাউকুলের প্রকৃত স্বাধ নষ্ট হয়।

৭.           বাউকুল গাছের পাতার গোড়া থেকে ১৫-৩০টি ফুল বের হয় এবং ফল হয়। দুপুরের আগে পরিপক্ক ফল পাড়তে হবে।

৮.           অনেক ছোট গাছে ফল আসে বলে গাছের কান্ডগুলো নরম থাকে এজন্য ফলের ভারে গাছ নুয়ে পড়ে। সে ক্ষেত্রে বাঁশের চটা দিয়ে গাছকে ঠেস দিয়ে উঁচু করে রাখতে হবে।

৯.           বাউকুল গাছে প্রচুর রোদ থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। ছায়া ঘেরা হলে ফলন কম হতে পারে।

বাউকুল আবাদে লাভ-লোকসানের তুলনামূলক চিত্র:

প্রথম বছর এক একর জমিতে বাউ কুলের চারা লাগানো যায়            ৫০০ টি

জমি  তৈরী বাবদ খরচ হবে                             ৭,০০০ টাকা

চারা ক্রয় বাবদ খরচ হবে                ৫০,০০০ টাকা

রাসায়নিক ও জৈব সার বাবদ খরচ হবে                     ৩০,০০০ টাকা

কীটনাশক বাবদ খরচ হবে            ৫,০০০ টাকা

কৃষি যন্তপাতি দা, কোদাল, ¯েপ্র মেশিন, কাচি ও ছুরি ইত্যাদি ক্রয় বাবদ     ৪,০০০ টাকা

পাহারাদার ও শ্রমিক বাবদ                             ৩৬,০০০ টাকা

মোট খরচ হবে    ১,৩২,০০০ টাকা (বা এর চেয়ে কম বেশি)

বাউকুলের হিসাব:

প্রতি গাছে কুল পাওয়া যাবে গড়ে  ১০ কেজি

৫০০ গাছে কুল পাওয়া যাবে          ৫০০ঢ ১০=৫,০০০ কেজি

গড় মূল্য ৫০ টাকা কেজি দরে মোট দাম আসবে     ৫০০০ঢ ৫০=২,৫০,০০০ টাকা

এক একর জমি থেকে প্রথম বছরে লাভ আসবে     ২,৫০,০০০-১,৩২,০০০=১,১৮,০০০ টাকা

২য় বছরে ক্ষেতের খরচের পরিমান কমে আসবে। আর কুলের পরিমান বাড়তে থাকবে, আর লাভের পরিমানও বাড়তে থাকবে।                গত বছর বাউকুল আসার পর বিভিন্ন সুপার সপে গিয়ে জানা যায় আপেল ও আঙ্গুরের চেয়ে বাউকুল ভোক্তারা কিনছে বেশি। পাশাপাশী বাউকুল থাকাকালিন আপেল ও আঙ্গুরের দাম কমে যায়।

সার ব্যবস্থাপণা:

 বাউকুল এর কলম চারা রোপন করার ১৫/২০ দিন পূর্বে প্রতি গর্তে ১০-১৫ কেজি গোবর ২০০ গ্রাম টিএসপি ২০০ গ্রাম পটাশ এবং ১০০ গ্রাম ইউরিয়া সার প্রয়োগ করতে হবে। তবে মাটি খুব উর্বর হলে রাসায়নিক সার দেওয়ার দরকার হয় না। রোপনের বছর বর্ষার আগে ও পরে গাছ প্রতি ৫০ গ্রাম করে পটাশ ও টিএসপি সার এবং ২০ গ্রাম ইউরিয়া সার প্রয়োগ করতে হয়। তবে গাছের বয়স বাড়ার সাথে সাথে সার প্রয়োগের পরিমানও বাড়াতে হবে। একটি পূর্ণ বয়স্ক গাছে ২০-৩০ কেজি পচা গোবর সার, ৫০০-৬০০ গ্রাম করে পটাশ ও টিএসপি সার এবং ৪০০ গ্রাম ইউরিয়া সার প্রয়োগ করা হয়। গাছের সার প্রয়োগের সময় খেয়াল রাখতে হবে যে, দুপুর বেলায় গাছ যে জায়গা জুড়ে চায়া প্রদান করে সে পরিমান জায়গা কোদাল দিয়ে ভাল করে গাছের গোড়া থেকে ৫০ সে.মি দুরে সার চিটিয়ে প্রয়োগ করে কোদাল দিয়ে মাটি কুপিয়ে ভাল ভাবে নাড়াচাড়া করে দিতে হয়। কোন ভাবে কাচা গোবর গাছের গোড়ায় দেওয়া উচিত নয়।

সেচ ও নিকাশঃ

প্রতিবার সার প্রয়োগের সময় সার মাটির সাথে বালভাবে মিশিয়ে দিয়ে সেচ প্রয়োগ করতে হয়। এছাড়া বর্ষাকালে পানি নিকাশ ও খরা মৌসুমে সকালে ও বিকালে নিয়মিত সেচ প্রদান করা দরকার। আর ভর দুপুরে গাছের গোড়ায় পানি দেয়া উচিত নয়।

বাউকুলের অন্তর্বর্তিকালীন পরিচর্যাঃ

১.            ফলগাছে সাধারণত নতুন গজানো চলতি বছরের প্রশাখায় ফর দরে, তাই কুল গাছের জন্য ছাঁটাই অত্যাবশাক। প্রতিবছর মৌসুমে ফল সংগ্রহের পর গাছের ফলধারণকারী ডাল সমূহ গোড়ার দিকে ৫০ সে.মি. রেখে কেটে ফেলতে হবে। কুল চাষে বালবাবে লক্ষ্য রাখতে হবে যে কুল বাগানের মধ্যে বা আশে পাশে যেন কোন জংলী বরই গাছ না থকে। কেননা এগুলো পাউডারি মিলডিউ রোগের জীবানু ও ফলের মাছির পোষক হিসাবে কাজ করে।

২.           কুল গাছে সাধারনত ফলের মাছি পোকা, শুঁয়া কীড়া শাঁশালো ও পাকা কুলের শ৭াসের মধ্যে ঢুকে মাঁস খেতে খেতে আটি পর্যন্ত পৌছে যায়। অনেক সময় আক্রান্ত ফল পচে যায়। শুয়া পোকা কচি পাতা থেকে শুরু করে বয়স্ক পাতা খেয়ে অনেক সময় গাছকে নিস্পত্র করে ফেলে। লাক্ষা পোকা কচি বিটপে প্রথমে আক্রান্ত করে পরবর্তিতে সাদাটে লাল পোকা (লাক্ষা)গুলো দ্বারা শাখা প্রশাখা আক্রান্ত হয়ে শুকাতে তাকে। উপরোক্ত এ পোকাগুলো দমনের জন্য ডাইমেক্রন/ডেসিস/সিমবুশ প্রতি ১০ রি. পানিতে ২৫মি.মি প্রয়োগ করে সহজেই দমন করা যায়।

৩.           ফল গাছে সাধারনত পাউডার মিলডিউ ও ফলের পচন রোগ দেকা যায়। এ রোগ দমনের জন্য ১% বোর্দোমিশ্রন বা ডায়থেন এম-৪৫প্রতি ১০লিটার পানিতে ৪৫ গ্রাম ভালবাবে মিশিয়ে প্রতি ৭দিন পরপর ২-৩বার স্প্রে করে এ রোগ সহজেই দমন করা যায়।

৪.           বাউকুল গাছে পোকা মাকড়ের আক্রমন হয় কম, তারপরও পাতা ফুটো করা পোকার আক্রমণ হলে কিংবা বাউকুল গাছের পাতার সবুজ অংশ পোকায় খেয়ে পাতা জালের মতো করে ফেললে কার্বারিল গ্রুপের সেভিন পাউডার ২গ্রাম পরিমান প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে। আর যদি পাতার রস খেয়ে পাতাকে কুচকে দেয় পাতাকে সাদা বা হলুদ বর্ণ হয়ে যায় সেক্ষেত্রে ডাইমিথোয়েট থার্টি-ইসি গ্রুপের যে কোন ঔষধ ২ মি.লি. পরিমান প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।

৫.           ফুল আসার আগে বাউকুল ক্ষেতের আগাছা নিড়ানী দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে এবং আগাছা পরিস্কারের পর একবার কার্বানিল গ্র“পের সেভিন পাউডার ২ গ্রাম পরিমান প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।

৬.           ফুল আসার শুরু থেকে গুটি বাধা পর্যন্ত ৭-১০ সপ্তাহ লাগে। এসময় টু ফোর-ডি অথবা নেপথেলিক এসিটিক এসিড (এনএএ) ১০-১৫ পিপিএম প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।

৭.           গুটি বাধার পর গুটি যদি সুন্দর না হয় কিংবা কোকড়ানো হয় তখন একবার হরমোন ¯েপ্র করতে হবে। তবে এই সমস্যাটি এখনও বাউকুলে দেখা যায় নি।

৮.           ফল আসার পর সকালে বিকালে গাছে পানির স্প্রে করলে ফল বেশি বড় হয় ও ফল ফেটে যায় না।

গাজীপুরাস্থ কালিয়াকৈর থানার মৌচাকের পাশে ভান্নারা গ্রামের মেসার্স সি টেড ফার্টিলাইজার লিমিটেডের বাউকুল প্রজেক্ট। প্রজেক্টের সাড়ে ৭ বিঘা জমিতে ৭৭০টি চারা রোপন করা হয়েছিল গত বছর। রোপনের চার মাস পর গাছে ফুল আসে এবং কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ফুল ফলে বা কুলে পরিণত হয়। প্রায় কাটাহীন গাছের নরম প্রকৃতির শাখা কুলের ভারে ভেঙ্গে পড়তে পারে এ জন্য বাঁশের খুটি বা চটার সাহায্যে ফলবান শাখাগুলিকে ঠেস দেয়া হয়েছে। প্রতি গাছ থেকে গড়ে প্রায় ৫০ কেজি কুল পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলনের স্থায়িত্ব কাল প্রায় দুই মাস। এই বাগান সম্পর্কে বলেন—“মো নুরুস সোবাহান, প্রজেক্ট ম্যানেজার, মেসার্স সি ট্রেড ফার্টিলাইজার লিমিটেড- আমরা এ বছর ৭৭০টি চারা এনে লাগিয়েছি এ পর্যন্ত সাড়ে তিন লাখ টাকার কুল বিক্রি করেছি। আমরা ক্ষেতেই ১০০ টাকা কেজি দরে কুল বিক্রি করছি। এছাড়া আমাদের যত আতœীয় স্বজন আছে সবার বাড়ীতে পাঠিয়েছি। আরো দেড় লাখ টাকার কুল বিক্রি হবে গাছে যা আছে। আমার বাগান করতে খরচ হয়েছিল মোট ২ লাখ ১৩ হাজার টাকা। সামনের বছরে খরচ তেমন লাগবেনা ফলন দ্বিগুন হবে বলে আশা করছি। কুল চাষ এত লাভ জনক আগে জানতাম না।”

বাণিজ্যিকভাবে চাষ আরম্ভের মধ্যেই প্রায় সব জেলার মাটি স্পর্শ করেছে বাউ কুলের চারা। ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলার দিউ গ্রামের মো. জোবায়েদ হোসেন পরাগ বাউকুলের প্রায় ৮ মাস পূর্বে ৩ বিঘা জমিতে বাউকুলের বাগান তেরীর কাজ শুরু করেন। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যারয়ের জার্ম প্লাজম সেন্টার থেকে ৩০০টি চারা ক্রয় করে এখানে রোপন করেন। প্রথমবারেই ২২৩ টি গাছে ফলন এসেছে। মৌসুম শেষে প্রায় ৩,০০০ কেজি কুল পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এ বাগান থেকে। যার বাজার মূল্য ৩ লাখ টাকারও বেশি। বাগান করতে খরচ হয়েছিল দেড় লাখ টাকার মতো। এর মধ্যে নীচু জমির মাটি ভরাট করে উচু করায় এবং প্রথম বছর হিসেবে লাভের পরিমানটা কম। তবে দ্বিতীয় বছর থেকে গাছের আকার যেমন বাড়বে, ফলনও তেমন বাড়বে, অন্যদিকে খরচের পরিমান কমবে। ফলে লাভের অংক বাড়বে অধিক হারে।

ময়মনসিংহের দিউফুলপুরের বাউকুল চাষী মো. জোবায়েদ হোসেন পরাগ জানান এ বছর তিনি দুই একর জমিতে বাউকুল আবাদ করেছেন তার খরচ হয়েছে ১ লাখ ৪৩ হাজার টাকা সেখান থেকে সে কুল বিক্রি করেছে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা। তার ধারনা আগামী বছর ৪ লাখ টাকার উপর বাউকুল পাবেন তার বাগান থেকে।

টেলিভিশন ও পত্র পত্রিকায় বাউকুলের কথা জানতে পেরে, কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার হাকিমপুর গ্রামের আসাদুল হক মোল্যা, বাউকুল চাষে আগ্রহি হোন। ১২ বিঘা জমিতে বাউকুল চাষ করেন। মাত্র ৬ মাস বয়সের গাছে গড়ে প্রায় ১০ কেজি পরিমান কুল ধরেছে এবং প্রতি কুলের ওজন প্রায় ১০০-১২০ গ্রামের ভেতর।

চারা, সার, কিটনাশক সব মিলিয়ে বিঘা প্রতি ১৭ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে তার। খরচ বাদে বিঘা প্রতি ৫০-৬০ হাজার টাকা লাভের সম্ভাবনা রয়েছে তার। আসাদুল হকের এই বাউকুল বাগানে প্রতিদিন কাজ করছেন ৩/৪ জন শ্রমিক। আসাদুল হকের বাউকুল বাগান কুষ্টিয়ার দৌলতপুর এলাকায় ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে। এ এলাকার অনেকেই এখন বাউকুল চাষে আগ্রহি হয়েছেন। তার বাগান নিয়োমিত পরিদর্শন করেন দৌলতপর উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা নাসিরুদ্দিন খান। সব ধরনের পরামর্শ দিয়ে তাকে সাহায্য করেন। সে আগামী বছর আরো ২০ বিঘা জমিতে বাউকুল আবাদ করবেন। সে বাউকুলের চারা কলম তৈরী করা শিখে ফেলেছেন। তার নিজের বাগানের উন্নত ধরনের বেশি ফলনের গাছ বাছাই করে সেখান থেকে চারা কলম করেছেন।

ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার টিকড়িয়া এলাকায় বাউকুলের বাগান করেছেন, বাংলাদেশ কৃষিবিশ্ববিদ্যালয়ে এমএস অধ্যায়নরত আনজুমান আরা। নিজের গবেষণা ছাড়াও বাণিজ্যিক দিক রয়েছে এ বাগানের। বাউ কুলের সাথী ফসল হিসেবে মৌসুমি শাক সবজীর চাষ করেছেন। যেমন মরিচ, পেয়াজ, ঢেঢ়শ, লালশাক পালংশাক, গাজর, টমেটো, ডাল ফসল ও তুলা ইত্যাদি। এছাড়া মৌ কলোনী বা মৌবাক্স স্থাপন করে, তাতে মৌ চাষের মাধ্যমে মধু উৎপাদন করেছেন। এছাড়া মৌমাছি যখন ফুলে ফুলে মধু আহরণ করে তখন ফুলের পরাগায়ন ঘটে এতে কুলের পরিমান বেশি হয়। এক মৌসুমে দুটি মৌবাক্স থেকে সে ২০ কেজি মধু পেয়েছেন।

ক্লেপ গ্রাফটিং পদ্ধতিতে চারা উৎপাদন:

গ্রীষ্মে মে-জুন এবং শীতে ডিসেম্বর-জানুয়ারী মাসে এ চারা উৎপাদন এবং রোপনের উপযুক্ত সময়। গাছে কুল থাকা অবস্থায় উচ্চ ফলনশীল গাছকে বিশেষ প্রতিকের সাহায্যে চিহ্নত করতে হবে। মৌসুমে সেই গাছগুলি থেকে সায়ন নিতে হবে। ক্লেপ গ্রাফটিং এর নিয়ম হচ্ছে- প্রথমে দেশিয় কুলের বিচি থেকে চারা উৎপাদন করতে হবে। কারণ এই চারার রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি থাকে। ঐ চারাকে গ্রাফটিং এর আদিজ চারা হিসেবে ব্যবহার করা যায়। এরকম একটি চারার ওপর ক্লেপ্ট গ্রাফটিং পদ্ধতিতে উপজ সায়ন স্থাপন করতে হয়।

কুলের মান অক্ষুন্ন রাখার জন্য বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্ম প্লাজম সেন্টারে ক্লেফ্ট গ্রাফটিং পদ্ধতিতে চারা উৎপাদন করা হচ্ছে। এবং এখান থেকে চারা দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে প্রতিষ্ঠিত ফার্ম বা নার্সারিতে এ চারা উৎপাদন করা যায়।

বর্তমানে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্ম প্লাজম সেন্টার ছাড়াও কয়েকটি নার্সারী এবং সরকারী, বেসরকারী সংস্থায় বাউকুলের চারা উৎপাদন ও বিপণন হচ্ছে এগুলি মধ্যে:

১.            আজাদ হাইব্রিড হর্টিকালচার সেন্টার, চুয়াডাঙ্গা ও গাজীপুরের কাপাসিয়া

২.           পঞ্চগড় নার্সারী, শালবাহান তেঁতুলিয়া, পঞ্চগড়

৩.           মডার্ন নার্সারী, নাটোর

৪.           শাহ্ নার্সারী, ঝিনাইদহ

৫.           সী ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, ভান্নারা, মৌচাক, গাজীপুর

৬.           জাহিদ-মাহফুজা এন্টারপ্রাইজ, যশোর

৭.           বি এ ডি সি

৮.           ডি এ ই

৯.           ব্র্যাক

১০.        প্রশিকা

১১.         ওয়ার্ল্ডভিশন

১২.        আর ডি আর এস   ও

১৩.        কারিতাস

আমরা আমাদের শ্যামল বাংলা অনুষ্ঠানের বাউকুলের উপর প্রথম অনুষ্ঠানে যে বাগানটিকে দেখিয়েছিলাম সেই বাগানটিকে চারার সায়ন সংগ্রহের মাতৃবাগান হিসেবে সনাক্ত করা হয়েছিল। সেই বাগান থেকে সায়ন সংগ্রহ করে নিজ নার্সারীতে চারা উৎপাদন করে সারা দেশে বাউকুলের চারা পৌছে দিচ্ছেন চুয়াডাঙ্গার আজাদ হাইব্রিড হর্টিকালচার সেন্টার। আজাদ হাইব্রিড হর্টিকালচার সেন্টারের সত্ত্বাধিকার আবুল কালাম আজাদ বাউকুলের চারা রোপনের নিয়োমকানুন বলেন-বাউকুলে চারা রোপনের জন্য, ৩ ফুট গভির দেড় ফুট ব্যাসার্ধ্যের বৃত্তাকার গর্ত করতে হবে। এর মধ্যে শতকার ৭৫ ভাগ পঁচা গোবর এবং ২৫ ভাগ মাটি, অর্থাৎ গর্তে ধারনকৃত মাটির তিন ভাগ পঁচা গোবর এবং এক ভাগ মাটি মিশৃত করে গর্ত পুরণ করতে হবে। তারপর চারা গর্তের মাঝখানে রোপন করতে হবে। ঝড় বাতাস থেকে রক্ষার অবলম্বন হিসেবে একটি বাঁশ বা চটার সঙ্গে চারাটিকে বেঁধে দিতে হবে। এরপর আগাছা পরিস্কার, প্রয়োজনীয় পানি, ক্ষেত্র বিশেষে সারও কীটনাশক প্রদান এবং প্রতি বছর গাছের গোড়ার মাটি পরিবর্তন করে, একই অনুপাতে পঁচা গোবর মিশৃত মাটি দিয়ে পরিচর্যা করলে একটি বাউকুল গাছ ফলন দিতে পারবে প্রায় চল্লিশ বছর পর্যন্ত। ক্ষতিকর পশু পাখির আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য বাউকুল বাগানের চার পাশে বেড়া ও নেট দেওয়া প্রয়োজন এবং পাখি তাড়ানোর জন্য বাগানের মাঝে বিভিন্ন স্থানে টিন স্থাপন করে রশীর সাহায্যে শব্দ করতে হবে। প্রতি বছর ফলন শেষে গাছের প্রধান কান্ড রেখে শাখা প্রশাখা কেটে ফেলতে হবে। তাতে পরিচর্যা করা সহজ হবে। কুলের মান উন্নত হবে। জমিতে অধিক গাছ রোপন করা যাবে। গাছের উচ্চতা ৭ ফুটের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে।  ৯ ফুট বাই ৯ ফুট দুরত্বে চারা লাগাতে হবে। তাতে প্রতি বিঘায় ১৭০ টির অধিক চারা লাগানো যাবে। বাংলাদেশের সর্বত্র সব মাটিতেই চাষ যোগ্য এই বাউকুল, বাড়ীর আঙ্গিনায়, ছোট রাস্তার পাশে, পুকুর পাড়ে, ফ্লাট বাড়ীর ছাদে উপযুক্ত ড্রামে বা টবেও চাষ করা যায়। এ কুলের চাষ ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেলে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানী করা সম্ভব হবে। তাই যাদের জমি ফেলে রাখা আছে তারা ফেলে না রেখে বাউকুলের আবাদ করতে পারেন। দারিদ্র বিমোচনে বাউকুল হোক এক হাতিয়ার।

বিলাতী গাব

বিলাতী গাব (Velvet apple): Diaspyros discolor Wild., Ebenaceae পরিবারভূক্ত চিরহরিৎ বৃক্ষ। ফল রোমস। পাকলে কালচে লাল হয়। মিষ্টি ফলের গন্ধ অনেকে পছন্দ করে না। বীজ থেকেই নতুন গাছ হয়। তেমন একটা বানিজ্যিক ভাবে উৎপন্ন হয় না। বাংলাদেশের প্রায় সব স্থানেই কোথাও কোথাও দু-একটা গাছ দেখা যায়। পরিকল্পিত বাগানে চাষ হয়না। পোকা মাকড় ও রোগবালাই সম্পর্কে তেমন কোন গবেষনা লব্ধ তথ্য নেই।

গাব

গাব (River ebony): Diospyros peregrina Gurke., Ebenaccae পরিবারের ফল। গাব চির সবুজ বৃক্ষ। পাকা ফল মিষ্টি তবে বড় বিচির সাথে লেগে খাবা অংশ কিছুটা খাওয়া গেলেও তেমন পছন্দের ফল হিসেবে এটি এখনো গ্রহন করা হয়নি। বাংলাদেশে বনে বাদাড়ে, বাড়ীর পাশে এখানে সেখানে দু একটা গাছ দেখা যায়। ফল হিসেবে এর মূল্য নগন্য।

বিলিম্বি

বিলিম্বি (Bilimbing): Averrhoa bilimbi L. oxilidaceae পরিবারভূক্ত ফল। গাছ ছোট-ঝোপাল। দো-আঁশ- বালি দো-আঁশ মাটিতে ভাল জন্মে। ফলের স্বাদ টক বলে মানুষের কাছে তেমন সমাদৃত নয়। বাংলাদেশে ঢাকা ও চট্টগাম অঞ্চলে বসতবাড়ীর আঙ্গিনায় বিনা যত্নে কোথাও কোথাও দেখা যায়। বীজ থেকে বংশ বৃদ্ধি হয়। বাগান আকারে বিলিম্বির চাষ হয় না।

পুষ্টিগুণ ও ব্যবহার: ফলে প্রচুর পরিমাণে এ্যাসকরবিক এ্যসিড আছে বলে সর্দি কাশি ও স্কার্ভি রোগের উপকারী ঔষধ । ফল তেতুলের মত খাওয়া যায়। আচার ও জেলি তৈরি করা যায়।

বৈচি/ পানিয়ালা

বৈচি (Puncala plum): Flacourtia Jangomas (lour)., Flacourtiacae পরিবারভূক্ত একটি ছোট পত্র পতনশীল ঝোপাল বৃক্ষ। বৈচিকে অনেকে পানিয়ালা ও বলে থাকে। ফল দুটি দেখতে এক রকম হলেও, একই পরিবারের সদস্য হলেও উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের মতে ফল দুটির গোত্র ভীন্ন। বৈচি গাছের কান্ড ও শাখা প্রশাখা কাঁটা যুক্ত। ফল দেখতে গাড় লাল বর্ণের, মিষ্টি ও সুস্বাদু।

জাত: বৈচির কোন অনুমোদিত জাত নেই।

বংশ বিস্তার: বীজ গুটি কলম ও শিকড়ের উপর ফাটল কলম করে এর বংশ বিস্তার করা যায়। বীজ থেকে অঙ্কুরোদগম হতে প্রায় দুই মাস সময় লাগে।

উৎপাদন পদ্ধতি ও পরিচয়াঃ এ ফলটির॥কোন প্রচলিত আবাদ নেই। বনে জঙ্গলে গুরুত্ববিহীন অবস্থায় এর দেখা মিলে। তবে ঘন করে ১ মি: দুরত্বে রোপন করলে বৈচির বেড়ায় সুন্দর ফল পাওয়া যেতে পারে। জুলাই-আগষ্ট মাসে বীজ বা চারা রোগন করা যায়। যে কোন রকমের মাটিতেই বৈচি জুে। সেপ্টেম্বর-অক্টোর মাসে ফল পাকে।

ফল সংগ্রহ ও ফলন: বীজরে গাছ চার বছরেই ফল দিতে শুরু করে। প্রতি গাছে গড়ে ২০ কেজি ফল পাওয়া যায়।

পুষ্টিগুণ ও ব্যবহার: বৈচি ফলের মালা বাজারে বিক্রি হয়। পাকা ফল ছোট বলে- সম্পূর্ন ফল খাওয়া যায়। জ্যাম, জেলি ও তৈরি করা যায়। বৈচির ভাল ঔষধিগুন আছে। পেটের পীড়া পিত্ত যন্ত্রনা নিবারণে এবং পাতা ও বাকলা দাতের অসুখের ঔষধ হিসেবে ব্যবহার হয়।

চালতা

চালতা (Indian dillenia):Dillenia indica L. Dilleniaceae পরিবারের চিরহরিৎ বৃক্ষ। বনে জঙ্গলে অযতেœ দাড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। বাংলাদেশের সব স্থানেই জন্মে।

জাত: বাংলাদেশে কোন অনুমোদিত জাত নেই।

উৎপাদন পদ্ধতি: পরিকল্পনা মাফিক উৎপাদন হয় না ও বুনো ফল বলে বিবেচিত বলে উৎপাদন ব্যবস্থাপনার তথ্য নেই।

পুষ্টিগুণ ও ব্যবহার: চালতার ফুলের বৃতিসমূহ খাওয়ার জন্য ব্যবহৃত হয়। চালতার যথেষ্ট ক্যালসিয়াম রয়েছে। কচি চালতা পেটের ব্যাথা, কফ, বাত ও পিত্ত নাশক। চালতা দিয়ে আচার ও জেলি তৈরি করা যায়।

ডালিম

ডালিম (Pomegranate): Punica granatum L., Puncia পরিবারভূক্ত একটি পত্র পতনশীল ছোট গাছ। বাংলাদেশের উষ্ণ আবহাওয়ার যে ছোট আকারের ডালিম হয়- সেগুলো এখন চির সবুজ গাছে পরিগনিত হয়ে গেছে। আনার ও ডালিম এক ফল হলেও বাংলাদেশের ডালিম আনারের চেয়ে অনেক নিু মানের। এর কারণ হচ্ছে আনার আসলে অবউষ্ণ মন্ডলের ফল। ডালিম ফলের মিষ্টতা ও গুণাগুনের জন্য প্রয়োজন শুষ্ক আবহাওয়া যা দীর্ঘ দিন ধরে অবস্থান করে। স্যাতসেতে আবহাওয়া এর ফলে বড় হয়না, মিষ্টিও হয়না। ভূমধ্য সাগরীয় ফল হিসাবে গন্য এ ফলটি বাংলাদেশে অতি নগন্য একটি ফল, যার চাহিদাও নেই বললেই চলে।

জাত: ইরান, আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও ভূম্যধ্যসাগরীয় আবহাওয়া অন্যান্য দেশের আনারের অনেক ভাল জাত থাকলেও- বাংলাদেশের ডালিমের কোন জাত নেই। দু-একটা গাছ বিনা যতেœই বসত বাড়ীর আশে পাশে বড়হয়ে উঠে। এগুলোর ফল ছোট হয়, বিচি বহুল ফলের স্বাদ তেমন ভাল মানের নয়। আবাদে মানুষের আগ্রহ কম। ফলে মাছি পোকার আক্রমন এত বেশী হয় যে প্রায়ই ফল খাবার অযোগ্য হয়ে পড়ে। বাংলাদেশে ডালিমের বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চাষাবাদের সম্ভাবনা খুব কম।

ডেইয়া/ ডেউফল

ডেইয়া/ ডেউফল (Monkey Jack): Artocarpus Laucha Bach, Moraceae পরিবারভূক্ত কাঁঠাল গোত্রের ফল। গাছ বৃহৎ ও ঝোপাল। বাড়ীর আশে পাশে অযত্নে দাড়িয়ে থাকে। ফল গোলাকার অমসৃন যৌগিক। প্রতিটি কোষের তুলনায় বিচি বড় বলে খেতে তেমন সুখকর নয়। আবার টক-মিষ্টি স্বাদের জন্য কিছু কিছু লোক পছন্দ করে। বাণিজ্যিক সুবিধা কম বলে- এ ফলটির পরিকল্পিত চাষাবাদ হয়ে উঠছেনা। ধীরে ধীরে এ ফলটি হারিয়ে যাচ্ছে। চাষ পদ্ধতির তেমন কোন তথ্য নেই। পুরানো গাছেল পাতায় লিফম্পট ছত্রাকের আধিক্য লক্ষ্য করা যায়।

পুষ্টিগুণ ও ব্যবহার : পাকা ফলে আমিষ, শর্করা, ভিটামিন বি-১ ও ভিটামিন বি-২ রয়েছে। পাকা ফল যকৃতের পীড়ার ঔষধে ও বাকল গুড়া চর্ম রোগ নিরসনে ব্যবহার করা হয়।

কুল

কুল/বড়ই (ঔঁলঁনব): তরুরঢ়যঁং গধঁহঃরধহধ খধসশ ধষংড় তরুরঢ়যঁং লঁলঁনধ ॥ জযধসহধপবধব পরিবার ভুক্ত।

জাতঃ আপেল কুল, নারিকেলী কুল, ঢাকা-৯০ থাই কুল, চান্দিনা, সাতক্ষীরা কুল, ইত্যাদি। আপেল কুলটির বর্তমানে দ্রুত বানিজ্যিক প্রসার ঘটেছে। মিষ্টি মাঝারী আকারের ফল; পরিপক্ক অবস্থায় ফরের গায়ে লালচে রং দেখা যায়। বীচি ছোট। তালি কলম ও ফাটল কলম বংশ বৃদ্ধি করা যায়, তবে তালি কলমে বংশ বৃদ্ধি শ্রেয়। ফাটল কলমে জোড় স্থান ঢিবিড় মত উঁচু হয়ে যেতে পারে।

উৎপাদন পদ্ধতিঃ যে কোন ধরনের মাটিতে জন্মে। মাঠে বীজ লাগিয়ে চারা উৎপাদন করা যায়। শক্ত বীজ ফাটিয়ে নিয়ে বুনলে সহজে চারা উঠবে। ৬ মিটার দূরত্বে বীজ বুনে চারা তুলে ১ বছর বয়সে কলম করা যায়। পলিথিন ব্যাগ বা টবে চারা তুলেও কলম করা যায়- তবে মাঠে সে চারা লাগানোর সময় অতি সতর্কতার সাথে লক্ষ্য রাখতে হবে যেন শিকড়ের অগ্রভাগ বা কোন অংশ যাতে ভেঙ্গে না যায়। শিকড়ের অগ্রভাগ ভেঙ্গে গেলে গাছটি প্রথমেই মরে যেতে পারে, অথবা পূর্ণ বয়সে ভালো ফলন দিবে না। এ জন্যে কুলের চারা বীজ তলায় উৎপাদন করে ঞৎধহংঢ়ষধহঃ না করাই শ্রেয়। এপ্রিল-জুলাই পর্যন্ত রোপন করা যাবে।

প্রতি গর্তে গোবর ২০ কেজি, টিএসপি ২৫০ গ্রাম সার দিতে হবে। গর্তের আকার ৭৫ী৭৫ সে.মি হবে। গোবর ও টিএসপি মাদায় মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। চারার উচ্চতা ২০ সে.মি হলে ২৫০ গ্রাম ইউরিয়া ও ২৫০ গ্রাম এমপি সার উপরি প্রয়োগ করতে হবে। প্রথম ২ বৎসর একই পরিমাণ সার প্রয়োগ করলেই চলবে। ৩ বয়সের গাছে ২৫ কেজি গোবর ও অন্যান্য সার দ্বীগুণ করে প্রদান করতে হবে। এর পর প্রতি বছর ১০% হারে সারের পরিমাণ বৃদ্ধি করতে হবে। বর্ষার আগে ও পরে দুইবার, প্রতিবার মোট সারের অর্ধেক পরিমাণ সার উপরি প্রয়োগ করতে হবে।

ফলন: হেক্টর প্রতি ১০-১২ টন।

পরিচর্যা: প্রতি বৎসর ফল দেয়া শেষ হলে সমস্ত গাছের মাথা ছেটে দিতে হবে। কলম করা স্থানের নিচ থেকে গজিয়ে ওঠা ডাল কেটে রাখতে হবে।

রোগ বালাই: পাউডারী মিলডিও; থিওভিট ২ গ্রাম/ লিটার পানিতে মিশিয়ে প্রয়োগ করতে হবে।

ফলের বিটল, বিছা ও কাটুই পোক রক্সিয়ন / পারফেক থিয়ন ২ মিলি/ লি. পানির সাথে মিশিয়ে ¯েপ্র করতে হবে।

পুষ্টিগুণ ও ব্যবহার; আমিষশ শর্করা, ক্যালিসিয়াম, লোহা ও ভিটামিন সি পর্যাপ্ত রয়েছে। পাকা কুল অত্যন্ত সুস্বাদু। আচার করেও খাওয়া যায়।

আঙ্গুর

আঙ্গুর আমাদের দেশে রোগীর পথ্য হিসেবে ব্যাপক ব্যবহৃত একটি ফল। এতে প্রোটিন,শর্করা,চর্বি, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, লৌহ, খনিজ, পটাশিয়াম, থায়ামিন, রিবোফ্লাবিন, ভিটামিন-এ, বি, সি উপাদান রয়েছে। তাছাড়া প্রতি কেজি আঙ্গুর থেকে প্রায় ৪৫০ ক্যালরি খাদ্যশক্তি পাওয়া যায়।

বর্তমানে বাংলাদেশেও আঙ্গুরের চাষ জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

মাটি

উর্বর অথচ পানি জমে থাকে না এমন দো-আঁশ মাটি আঙ্গুর চাষের জন্য উপযুক্ত। তবে বেলে দো-আঁশ মাটিতেও পর্যাপ্ত জৈব সার ব্যবহার করে আঙ্গুর চাষ করা যায়। আমাদের দেশের যে অঞ্চলের মাটির পিএইচ ৬.৫০ থেকে ৭.০০ এর মধ্যে আছে সেসব অঞ্চলে আঙ্গুর চাষ ভালো হবে। যেসব অঞ্চলের মাটিতে পিআইচ ৫.৫০ এর নিচে সেসব অঞ্চলে আঙ্গুর চাষ করতে হলে মাটিতে চুন ব্যবহার করতে হবে। আঙ্গুর চাষের জন্য পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাতের দরকার হলেও ভেজা ও স্যাঁতসেঁতে মাটিতে আঙ্গুরের চারা বাড়তে পারে না। তাছাড়া শক্ত মাটি আঙ্গুর চাষের জন্য ভালো নয়। তাই বাতাস চলাচলসহ গাছের প্রয়োজনীয় পানিও খাদ্য ধারণে সক্ষম এবং প্রচুর জৈব পদার্থ রয়েছে এমন মাটি আঙ্গুর চাষের জন্য উপযোগী।

জাত:

বাংলাদেশে বর্তমানে আঙ্গুরের ৩টি জাত বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। জাতগুলো হলো-

জাক্কাউ:

এ জাতটি বছরে দু’বার ফলন দেয়। প্রথমবার মার্চ-এপ্রিলে (১৭ ফাল্গুন-১৭ বৈশাখ) ফুল আসে এবং জুন-জুলাইতে ফল পাকে, দ্বিতীয়বার ফল আসে জুলাই-আগস্টে (১৭ আষাঢ়-১৬ভাদ্র) এবং ফল পাকে অক্টোবর-নভেম্বর (১৬ আশ্বিন-১৬ অগ্রহায়ন) মাসে। ফুল হতে ফল পাকার জন্য মোট ১২০দিন সময় লাগে। প্রথমদিকে আঙ্গুরের রঙ গাঢ় সবুজ থাকে তবে পাকার আগে বাদামী রঙ ধারণ করে। এ আঙ্গুরে বীজ থাকে, ছল কিছুটা শক্ত, তবে বেশ রসালো এবং চিনি বা ফ্রুকটোজের পরিমাণ শতকরা ১৮-২০ ভাগ। এ থেকে জ্যাম, জেলি ও আচার তৈরি করা যায়।

ব্ল্যাক পার্ল:

এটি একটি দ্রুতবর্ধনশীল জাত। লতা হালকা খয়েরী রঙয়ের এবং জাক্কাউয়ের মতো বছরে দু’বার ফলন দেয়। ফুল আসার প্রায় ৮০-৯০ দিন পর থেকে আঙ্গুরের সবুজ রঙ ধীরে ধীরে মেরুন রঙ-এ পরিবর্তিত হয় এবং পাকার পূর্বে সম্পূর্ণ গাঢ় কালো-লাল রঙ-এ রুপান্তরিত হয়। এটিও বীজযুক্ত আঙ্গুর এবং এতে চিনির পরিমাণ রয়েছে শতকরা ১৭-১৮ ভাগ।

ব্ল্যাক রুবি:

এ জাতের গাছ ধীরে ধীরে বাড়ে এবং কচি অবস্থায় পাতা হালকা লাল রঙয়ের হয়। এ জাতের আঙ্গুরের রং প্রথমে সবুজ হলেও পরে ফুল আসার ৮০-৯০ দিন পর চামড়ার রঙ কালো হতে শুরু করে এবং পাকলে গাঢ় কালো রঙ হয়ে যায়। জাক্কাউয়ের মতো এরাও বছরে দু’বার ফলন দেয়। বীজযুক্ত এ আঙ্গুরে চিনির পরিমাণ শতকরা ১৮-১৯ ভাগ। ফল পাকতে ১১০ থেকে ১২০ দিন সময় লাগে। এ জাতের ফলন পূর্বেও দুই জাতের তুলনায় কম হলেও থোকাগুলো খুবই আকর্ষনীয়।

এখানে আলোচিত ৩টি জাত ছাড়া আমাদের দেশে আরো যেসব জাতের চাষ করা যেতে পারে সেসব হচ্ছে- হোয়াইট মালাগ, বাঙ্গালোর নীল, কনর্কড, বিউটি সীডলেস, পুষা সীডলেস, থমসন সীডলেস, আনাব-ই-শাহী, পারফেক্ট ইত্যাদি।

বংশ বিস্তার:

আঙ্গুরের বংশ বৃদ্ধি বীজ এবং কলমের মাধ্যমে হতে পারে। তবে বিভিন্ন পরীক্ষায় দেখা গিয়েছে যে, বীজের মাধ্যমে বংশবিস্তার করা হলে মাতৃগাছের গুণাগুণ সঠিকভাবে বজায় থাকে না। অপরদিকে কাণ্ডের কাটিং প্রাফটিং ও বার্ডিং পদ্ধতিতে কলমের মাধ্যমে বংশবিস্তার করলে মাতৃগাছের গুণাগুন যথেষ্ট বজায় থাকে। তাই বীজের পরিবর্তে কলমের মাধ্যমে বংশ বিস্তার বা চাষাবাদ করাই উত্তম। আঙ্গুরের কলম তৈরির কয়েকটি পদ্ধতি এখানে সংক্ষেপে বর্ণনা করা হলোঃ

কাটিং পদ্ধতি:

এটি সবচেয়ে সহজ ও জনপ্রিয় পদ্ধতি। প্রধানত শীতের সময় আঙ্গুর গাছ সুপ্ত অবস্থায় থাকে। সেজন্য কাটিং করার এটিই উপযুক্ত সময়। কাটিং করতে হলে জানুয়ারি (১৮পৌষ-১৮মাঘ) মাসের দিকে প্রথমে তিন চোখবিশিষ্ট একটি কাণ্ড বেছে নিতে হবে। তারপর ১৫ সে.মি. লম্বা করে কাণ্ডটি ধারালো ছুরি দিয়ে উপরের দিকে সমান তেরছা করে এবং নিচের দিকে সমান্তরাল করে কাটতে হবে। কাণ্ড কাটার পর সেগুলো একত্রিত করে বেঁধে অন্ধকার ঘরে প্রায় ২৪ ঘন্টা রেখে দিতে হবে, যাতে কাটা অংশ থেকে বের হওয়া আঠালো রস শুকিয়ে যেতে পারে। তারপর কাণ্ডের একটি চোখ গিঁটসহ কিছুটা কাত করে বীজতলায় রোপণ করতে হবে, অপর দু’টি চোখ মাটির উপরের দিকে থাকবে। কাটিং রোপণের ৪-৫ সপ্তাহ পর সেচ দিতে হবে এবং কাটিং রোপণের ৩-৪ মাস পর চারাগুলো মূল জমিতে রোপণ করতে হবে। সাধারণত জানুয়ারি (১৮ পৌষ-১৮ মাঘ) মাসে কাটিং বীজতলায় রোপণ করা হলে, ফ্রেরুয়ারি (১৯মাঘ-১৬ ফাল্গুন) মাসে নতুন পাতা গজাতে শুরু করে এবং মার্চ-এপ্রিল (১৮ ফাল্গুন-১৬ চৈত্র) মাসে মূল জমিতে রোপণের উপযুক্ত হয়।

গুটি কলম পদ্ধতি:

আঙ্গুরের সুস্থ, সবল ও সোজা কাণ্ড বেছে নিয়ে তার ২-৩ সে.মি (১ ইঞ্চি) পরিমাণ জায়গা থেকে বাকল বা চামড়া ছুরি দিয়ে তুলে ফেলতে হবে, যাতে কাঠ দেখা যায়। তবে কাণ্ডের বাকল তোলা স্থানটি যাতে দু’টি চোখের মাঝামাঝি অবস্থানে থাকে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। তারপর বাকল তোলা স্থানে সার-গোবর মিশ্রিত মাটি (৩ ভাগ এঁটেল মাটি ও ১ ভাগ পচা গোবর) লাগিয়ে পলিথিন কাগজ দিয়ে মুড়িয়ে দুই মাথায় সুতলী দিয়ে বেঁধে দিতে হবে। এভাবে ৩-৪ সপ্তাহ থাকার পর বাকল তোলা স্থান থেকে নতুন শিকড় গজাতে শুরু করবে এবং তখন তা কেটে মূল জমিতে রোপণের ব্যবস্থা করতে হবে।

বাডিং পদ্ধতি:

বাডিং পদ্ধতিতে আঙ্গুরের এক জাতকে অন্য জাতে রূপান্তরিত করা যায়। এ পদ্ধতি গোলাপ ফুলের বাডিং এর মতোই। প্রথমে স্টক গাছের কিছু অংশের চামড়া বা বাকল তুলে সেখানে অন্য একটি নির্বাচিত গাছের একই পরিমাণ চোখসহ চামড়া লাগিয়ে প্লাস্টিকের পাতলা কাগজ দিয়ে চোখটা বাদ দিয়ে বাকি অংশ মুড়িয়ে দিতে হবে এবং ১০-১৪ দিন পর দেখা যাবে যে সংযুক্ত বাকলটি স্টক গাছের সাথে লেগে গেছে। তখন প্লাষ্টিক কাগজের বাঁধন খুলে দিতে হবে এবং স্টক গাছের উপরের অংশ কেটে দিতে হবে।

গাছের কাণ্ড ছাঁটাই পদ্ধতি:

আঙ্গুর গাছের ডাল ও কাণ্ড ছাঁটাই অত্যন্ত জরুরি একটি বিষয়। আঙ্গুর গাছের নতুন ডালে ফুল ও ফল ধরে বিধায় সঠিক নিয়মে কাণ্ড ছাঁটাই না করা হলে ফুল ফল ধরবে না। গাছ রোপণের পর হতে মাচায় ওঠা পর্যন্ত প্রধান কাণ্ড ছাড়া অন্যান্য সকল পার্শ্ব শাখা ভেঙে দিতে হবে যাতে গাছ তাড়াতাড়ি বাড়ে। এখন আঙ্গুরের কাণ্ড ছাঁটাই পদ্ধতি বিষয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো।

প্রথম ছাঁটাই:

মাচায় কাণ্ড উঠার ৫০ সে.মি (২০ ইঞ্চি) পর প্রথম কাণ্ডের শীর্ষদেশ ভেঙে দিতে হবে যাতে কাণ্ডের উভয়দিক হতে দু’টি করে চারটি শাখা গজায়।

দ্বিতীয় ছাঁটাই:

প্রথম ছাঁটাইয়ের ১৫-২০ দিন পর যখন শাখাগুলো আরো প্রায় ৫০ সে.মি. (২০ ইঞ্চি) পরিমাণ হবে তখন উক্ত ৪টি শাখার মাথা কেটে দিতে হবে যাতে প্রতিটি শাখার উভয়দিক হতে পূর্বের মতো ২টি করে মোট ১৬টি প্রশাখা গজায়।

তৃতীয় ছাঁটাই:

১৬টি প্রশাখা ২০-২৫ দিন পর যখন প্রায় ৪০-৫০ সে.মি. লম্বা হবে তখন আবারো প্রত্যেকটি প্রশাখার মাথা কেটে দিতে হবে। এভাবে ১৬টি প্রশাখা হতে ৬৪টি প্রশাখা গজাবে। তবে গাছের দুর্বলতার জন্যে অনেক

সময় এতগুলো প্রশাখা পাওয়া যায় না। সাধারণত আঙ্গুর গাছের ছাঁটাই খুব সাবধানে করা দরকার যাতে ফলবান শাখা ছাঁটাইয়ের মাধ্যমে না কাটা পড়ে।

জমি তৈরি ও সার প্রয়োগ:

পানি জমে থাকবে না অথবা পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রয়েছে এমন বেলে দো-আঁশ মাটির জমি আঙ্গুর চাষের জন্য নির্বাচন করা হয়ে থাকে। বাগান তৈরির পূর্বে জমি ভালোভাবে চাষ করে মাটি ঝুরঝুরা করে নিতে হবে। তারপর চারা রোপণের জন্য মাদা বা গর্ত তৈরি করতে হবে। গর্তের আকার হবে যথাক্রমে দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও গভীরতায় ৭৫ সে.মি. (২১২ফুট) হারে। চারা রোপণের পূর্বে প্রতি মাদা বা গর্তে ৪০ কেজি গোবর বা আবর্জনা পচা সার, ১০০ গ্রাম ইউরিয়া, ৫০০ গ্রাম টিএসপি, ৪০০ গ্রাম এমপি সার এবং ১০০ গ্রাম সরিষার খৈল ভালোভাবে মাদার মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। তারপর গর্ত বা মাদাটি ২০-২৫ দিন ফেলে রেখে নিয়মিত সেচ দিতে হবে যাতে মাদায় সারগুলো পচে যায়।

চারা রোপণ:

সার প্রয়োগের পর মাদা বা গর্তটি যখন চারা রোপণের উপযুক্ত হবে তখন বীজতলা থেকে সুস্থ, সবল ও সতেজ চারা তুলে রোপণের ব্যবস্থা করতে হবে। চারা রোপণের পর হালকা সেচ দিতে হবে এবং চারাটি যাতে সোজা হয়ে বাড়তে পারে সেজন্য একটি কঞ্চি বা খুর্ঁুটি চারার সাথে হালকা করে বেঁধে দিতে হবে। বাংলাদেশে সার বছরই আঙ্গুরের চারা রোপণ করা যায় এবং এ দেশের আবহাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে মার্চ-এপ্রিল (১৭ ফাল্গুন-১৭বৈশাখ) মাস চারা রোপণের উপযুক্ত সময়।

সার ব্যবস্থাপনা:

চারার বয়স          সারের মাত্রা/ চারা বা গাছপ্রতি

গোবর                   গরিষার খৈল        ইউরিয়া                           টিএসপি               এমওপি

১-৩ বছর             ২৫ কেজি             ৫০ গ্রাম                ১০০ গ্রাম             ৫০০ গ্রাম             ৪০০ গ্রাম

৪ বছর এবং এর অধিক  ৩০-৪০ কেজি    ১০০ গ্রাম             ১৫০ গ্রাম             ৬০০ গ্রাম             ৫০০ গ্রাম

 প্রতি বছর জানুয়ারি মাসে গাছ ছাঁটাইয়ের পর উল্লিখিত হারে সার প্রয়োগ করা প্রয়োজন।

অন্যান্য পরিচর্যা:

# আঙ্গুরের চারা রোপণের পর ফুল আসার সময় এবং খরার সময় গাছে পরিমিত সেচ দিতে হবে।

# আঙ্গুরের কাণ্ড লতা ভালোভাবে বেড়ে উঠার জন্য মাচা তৈরি করে দিতে হবে।

# অম্লীয় মাটিতে অম্লতা কমানোর জন্য বৎসরে দু’বার চুন প্রয়োগ করতে হবে।

# বর্ষার আগে ও পরে চারার গোড়ার আশপাশের আগাছা পরিষ্কার করে দিতে হবে এবং হালকাভাবে মাটি কুপিয়ে দিতে হবে।

# ফলের গুণাগুণ বৃদ্ধিও জন্য আঙ্গুরের গুচ্ছ হতে অপরিণত ফল ছোট অবস্থায় ফেলে দিতে হবে।

# আঙ্গুর পাকার মাস খানেক আগে গাছ প্রতি ২০ গ্রাম পটাশ সার ১ লিটার পানির সাথে মিশিয়ে গোড়ায় ¯েপ্র করলে আঙ্গুরের মিষ্টতা বাড়বে।

# যখন আঙ্গুর মুগ ডালের মতো হবে তখন ‘জিবরেলিক এসিড’ নামক হরমোন গাছে স্প্রে করলে ফল ঝরা বন্ধ হবে, আঙ্গুরের আকার বড় হবে, মিষ্টি হবে এবং আঙ্গুর ফেটে যাওয়া রোধ হবে।

ফল সংগ্রহ:

আঙ্গুর গাছের সমুদয় ফল গাছে পরিপূর্ণ ভাবে পাকার পর সংগ্রহ করা উচিত। আঙ্গুরের থোকা এমনভাবে কাটা উচিত যাতে হাতের ছোঁয়ায় ফলের ওপরের পাউডার জাতীয় পদার্থ নষ্ট হয়ে না যায়।

ফলন

ভালোভাবে চাষ করলে প্রতিটি গাছ থেকে গড়ে ৪ কেজি আঙ্গুর পাওয়া যেতে পারে।

পেঁপে চাষ

পেঁপে বাংলাদেশের একটি অন্যতম জনপ্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ ফল। শুধু ফলই নয়, সবজি হিসেবেও এর ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। এটি স্বল্পমেয়াদী সুস্বাদু, পুষ্টিকর এবং ওষুধি সম্পন্ন। আমের পরই ভিটামিন-এ এর প্রধান উৎস হলো পাকা পেঁপে।

মাদায় চারা রোপণ:

বীজতলায় বা পলিথিন ব্যাগে উৎপাদিত ২মাস বয়সের চারা জমিতে মাদা বা গর্ত করে রোপণ করতে হবে। মাদা তৈরির সময় এক মাদা থেকে অপর মাদার দূরত্ব রাখতে হবে ২ মিটার এবং মাদার আকার হবে দৈর্ঘ, প্রস্থ ও গভীরতায় প্রায় ৬০ সে.মি. । প্রতি মাদায় ৩টি করে চারা রোপণ করতে হবে। দু’সারির মাঝামাঝি নালার ব্যবস্থা রাখলে সেচ বা বৃষ্টির অতিরিক্ত পানি নিকাশের সুবিধা হবে।

সার প্রয়োগ:

প্রতি গর্তে নিুরূপ সার ব্যবহার করতে হবে-

সারের নাম          পরিমাণ

জৈব সার              ১২-১৫ কেজি

টিএসপি               ৫০০ গ্রাম

জিপসাম              ২৫০ গ্রাম

 বোরাক্স                ২৫-৩০ গ্রাম

জিংক সালফেট  ১৫-২০ গ্রাম

চারা লাগানোর পর গাছে নতুন পাতা আসলে ইউরিয়া ও এমপি সার ৫০ গ্রাম করে ১ মাস অন্তর প্রয়োগ করতে হবে। গাছে ফল আসলে এ মাত্রা দ্বিগুণ করতে হবে।

অন্তর্বতীকালীন পরিচর্যা:

* পেঁপে গাছ পুরুষ, স্ত্রী কিংবা উভয লিঙ্গেও মিশ্রণ হতে পারে। প্রতি মাদায় ৩টি করে পেঁপের চারা রোপণ করতে হয়। পরে গাছে ফুল আসলে প্রতি মাদায় একটি করে স্ত্রী অথবা উভয় লিঙ্গ গাছ রেখে বাকিগুলো কেটে ফেলতে হবে। পরাগায়নের জন্য প্রতি ১০-১৫টি স্ত্রী গাছের জন্য একটি পুরুষ গাছ রাখতে হবে।

* বেশি করে পেঁপে ফলানোর জন্য অনেক সময় কৃত্রিম পরাগায়ন দরকার হয়। সকাল বেলায় সদ্য ফোটা পুরুষ ফুল সংগ্রহ করে এর পাঁপড়িগুলো ছিঁড়ে ফেলে দিয়ে পুংকেশর স্ত্রী ফুলের গর্ভ কেশরের উপর ধীরে ধীরে, ২-৩ বার ছোঁয়ালে পরাগায়ন হবে। এভাবে একটি পুরুষ ফুল দিয়ে ৫-৬টি স্ত্রী ফুলের পরাগায়ন করা যেতে পারে।

পেয়ারা

পেয়ারা একটি দ্রুত বধর্নশীল গ্রীষ্মকালীন ফল। বাংলাদেশের সর্বত্রই এ ফল জন্মে থাকে। তবে বাণিজ্যিক ভাবে বরিশাল. পিরোজপুর, ঝালকাটি, চট্রগ্রাম. ঢাকা, গাজীপুর, কুমিল্লা মৌলভীবাজার, খাজড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি প্রভুতি এলাকায় এর চাষ হয়ে থাকে।

ওষুধিগুণ:

শিকড়, গাছের বাকল, পাতা এবং অপরিপক্ক ফল কলেরা, আমাশয় ও অন্যান্য পেটের পীড়া নিরাময়ে ভাল কাজ করে। ক্ষত বা ঘাঁতে থেতলানো পাতার প্রলেপ দিলে উপকার পাওয়া যায়। পেয়ারা পাতা চিবালে দাতের ব্যথা উপশম হয়।

জাত:

বাংলাদেশে চাষকৃত পেয়ারার জাতের মধ্যে স্বরূপকাঠি, কাঞ্চন নগর ও মুকুন্দপুরী উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনষ্টিটিটিউট কর্তৃক উদ্ভাবিত দু’টি উন্নত জাত হলো কাজী পেয়ারা ও বারি পেয়ারা-২।

জমি নির্বাচন ও তৈরি:

নিকাশযুক্ত উর্বর বেলে-দোআঁশ মাটি পেয়ারা চাষের জন্য উত্তম। উঁচু ও মাঝারি উঁচু জমি নির্বাচন করতে হবে। চাষ ও মই দিয়ে জমি সমতল ও আগাছামুক্ত করে নিতে হবে।

রোপণ পদ্ধতি:

সমতল ভূমিতে বর্গাকার ও ষড়ভুজী এবং পাহাড়ি ভূমিতে কন্টুর।

রোপনের সময়:

পেয়ারার চারা সাধারণত : মধ্য জ্যৈষ্ঠ থেকে মধ্য আশ্বিন (জুন-সেপ্টেম্বর) মাসে রোপণ করা হয়।

রোপণের দুরত্ব:

সারি থেকে সারি ৬ মিটার (২০ ফুট) ও চারা থেকে চারা ৪মিটার (১৩ ফুট)।

গর্ত তৈরি:

গর্তের আকার হবে ৫০ সে.মি ও চওড়া ৫০ সে.মি গভীর।

প্রতি গর্তে সারের পরিমাণ:

প্রতি গর্তে যে হাবের সার প্রয়োগ করতে হবে তাহলো- গবর ১৫-২০ কেজি, পচা খৈল ১-২ কেজি, টি এস পি ১৫০-২০০ গ্রাম, এমপি ১৫০-২০০ গ্রাম।

রোপণ:

গর্ত ভর্তির ১০-১৫ দিন পর চারাটি গাড়ার মাটির বলসহ গর্তের মাঝখানে সোজাভাবে লাগাতে হবে। চারা রোপণের পর পানি, খুটি ও বেড়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

সার প্রয়োগ:

পেয়ারা ফসল থেকে উচ্চ ফলন প্রাপ্তি অব্যাহত রাখতে হলে সে হারে প্রতি গাছে সার প্রয়োগ করতে হবে। পাঁচ বছরে নিচে হলে গোবর ২০-২৫ কেজি, ইউরিয়া ৩০০-৪০০ গ্রাম, টিএসপি ৩০০-৪০০ গ্রাম, এমপি ৩০০-৪০০ গ্রাম। আর পাঁচ বছরের ওপরে হলে গোপর ২৫-৩০ কেজি, ইউরিয়া ৫০০-৭০০ গ্রাম, টি এসপি ৪৫০-৫৫০ গ্রাম, এমপি ৪৫০-৫৫০ গ্রাম।

সেচ:

খরার সময় ২-৩ বার পানি সেচ দিতে হবে।

ডাল ছাঁটাই:

পেয়ারা সংগ্রহের পর ভাঙ্গা, রোগাক্রান্ত ও মরা শাখা-প্রশাখা ছাঁটাই করে ফেলতে হবে। তাতে গাছে আবার নতুন নতুন কুড়ি জন্মাবে।

ফল পাতলাকরণ:

কাজী পেয়ারা ও বারি পেয়ারা-২ জাতের গাছ প্রতিবছর প্রচুর সংখ্যক ফল দিয়ে থাকে। ফল পাতলা না করলে গাছ ভেঙ্গে যায়। তাই মার্বেল আকৃতি হলেই কমপক্ষে শতকরা ৫০ ভাগ ফল ছাঁটাই করতে হবে। এতে ফলের আকার আর্কষণীয় হয়।

এ্যানথ্রাকনোজ রোগ:

পেয়ারা গাছের পাতা, কান্ড—, শাখা-প্রশাখা ও ফল এ রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে। প্রথমে পেয়ারার গায়ে ছোট ছোট বাদামি রঙয়ের দাগ দেখা যায়। দাগগুলো ক্রমান্বয়ে বড় হয়ে পেয়ারার গায়ে ক্ষতের সৃষ্টি করে। আক্রান্ত ফল পরিপক্ক হলে অনেক সময় ফেটে যায়। তাছাড়া এ রোগে আক্রান্ত ফলের শাঁস শক্ত হয়ে যায়। গাছের পরিত্যক্ত শাখা-প্রশাখা, ফল এবং পাতায় এ রোগের জীবাণু বেঁচে থাকে। বাতাস ও বৃষ্টির মাধ্যমে পেয়ারার এ্যানথ্রাকনোজ রোগ ছড়ায়। গাছের নিচে ঝড়ে পড়া পাতা ও ফল সংগ্রহ করে পুড়ে ফেলতে হবে। গাছে ফল ধরার পর ফলিকুর ইডব্লিউ ২৫০ প্রতি লিটার পানিতে ০.৫ মিলি হারে অথবা টিল্ট-২৫০ ইসি প্রতি লিটার পানিতে ০.৫ মিলি হারে মিশিয়ে ১৫ দিন অন্তর ৩-৪ বার ভালভাবে ¯েপ্র করে এ রোগ দমন করা যায়।

ডাই ব্যাক (ডগা মরা):

গাছের কচি ডাল আগা থেকে শুকিয়ে মরে যেতে থাকে। আক্রান্ত গাছে ডাইথেন এম-৪৫ (০.২%) অথবা বর্দোমিশ্রন (১%)স্প্রে  করতে হবে।

সাদা মাছি পোকা:

এ পোকা পাতার নিচের দিকে আক্রমণ করে রস চুষে খায়। পাতায় সুটিমোল্ড ছত্রাক (কালো রঙ) জন্মে এবং পাতা ঝড়ে যায়। প্রতি লিটার পানিতে ১০ গ্রাম ডিটারজেন্ট মিশিয়ে ৩ দিন পরপর তিনবার অথবা এডমায়ার ১ লিটার পানিতে ০.৫ মিলি হারে সপ্তাহে ১-২ বার ¯েপ্র করে এ পোকার আক্রমণ কমানো যেতে পারে।

মাছি পোকা:

স্ত্রী মাছি পোকা ফলের খোসার ওপর ডিম পাড়ে। ডিম ফেটে কীড়া বের হয়ে ফল ছিদ্র করে ভেতরে প্রবেশ করে এবং ফল নষ্ট করে ফেলে। ফল ছোট অবস্থায় ব্যাগিং করে ফলের মাছি পোকা দমন করা সম্ভব। আক্রান্ত ফল সংগ্রহ করে ধ্বংস করতে হবে। ফল পাকার এক থেকে দেড় মাস পূর্বে থেকেই ডেসিস ২.৫ ইসি প্রতি ১০ দিন পরপর দু’বার ¯েপ্র করতে হবে।

ফল সংগ্রহ:

সবুজ থেকে হলদে-সবুজ রঙ ধারণ করলে ফল সংগ্রহের উপযুক্ত হয়।

কাঁঠালের রোগ ও তার প্রতিকার-

পচা রোগ:

রাইজোপাস অটোকারপি নামক ছত্রাকের আক্রমনে কাঁঠালের মুচি বা ফল পচা রোগ হয়ে থাকে। গাছের পরিত্যক্ত অংশে এ রোগের জীবাণু বেঁচে থাকে এবং বাতাসের মাধ্যমে তা বিস্তার লাভ করে। এ রোগের আক্রমনে নিম্নলিখিত লক্ষন গুলো প্রকাশ পায়-

লক্ষণ:

১। কচি ফলের গায়ে বাদামী রঙের দাগ হয়।

২। আক্রমনের শেষ পর্যায়ে ফল গাছ থেকে ঝরে পড়ে।

প্রতিকার:

১। গাছের নিচে ঝরে পড়া পাতা ও ফল পুড়ে ফেলতে হবে। টেবুকোনাজল গ্র“পের ছত্রাকনাশক (যেমন; ফলিকুর ইডব্লিউ ২৫০) প্রতি ১০ লিটার পানিতে ১০ মিলি মিশিয়ে গাছে ফুল আসার পর থেকে ১৫ দিন পর পর ৩ বার ¯েপ্র করতে হবে।

মুচি ঝরা রোগ:

সাধারণত রাইজোপাস নামক ছত্রাকের কারণে কাঁঠালের (স্ত্রী পুষ্পমঞ্জুরী) ছ্টো অবস্থাতেই কালো হয়ে ঝরে পড়ে।

প্রতিকার:

১। মুচি ধরার আগে ও পরে ১০ দিন পর পর ২ থেকে ৩ বার কপার অক্সিক্লোরাইড গ্র“পের ছত্রাকনাশক ( যেমন; কুপ্রাভিট ৫০ ডব্লিউপি) প্রতি দশ লিটার পানিতে ২০ গ্রাম হারে মিশিয়ে ¯েপ্র করতে হবে।

২। ডাইথেন এম ৪৫ বা রিডোমিল এম জেড ৭৫ প্রতি ১০ লিটার পানিতে ২৫ গ্রাম হারে মিশিয়ে ¯েপ্র করতে হবে।

সফেদা

সফেদা (Chiku): Achras zapota L., Sapotaceae পরিবারভুক্ত চির সবুজ গাছ। যে কোন মাটিতেই জন্মায়- বন্যা ও জলাবদ্ধতা (সাময়িক) সহনশীল।

জাতঃ বারি সফেদা-১, ১৯৯৬ সালে অনুমোদিত। সারা বছর ফল ধরে তবে মার্চ-এপিল ও আগষ্ট-সেপ্টেম্বর বেশী ফল দেখা যায়।

বংশ বিস্তার: বীজ থেকে গজানো খিরনি গাছের উপর-জোর, ফাটল বা পার্শ্ব কলম করা যায়। চোখ কলম ও সফল হয়।

উৎপাদন পদ্ধতি:

চারা রোপন: ৬x৬ মি. দূরত্বে ৭৫x৭৫ সে. মি গর্ত খুঁড়ে সার দিয়ে চারা রোপন করতে হয়। হেক্টরে ২৭৮ টি চারা লাগবে। প্রতি গর্তে গোবর ১০ কেজি ও টিএসপি ১৫০ গ্রাম, জিঙ্ক সালফেট ২৫ গ্রাম, ও জিপসাম ২০০ গ্রাম মাটির সাথে মিশিয়ে গর্তে দিতে হবে। চারা রোপনের পর পানি দিতে হবে। চারা রোপনের ৫০-৬০ দিন পর ১৫০ গ্রাম ইউরিয়া ও ১৫০ গ্রাম এমপি সার উপরি প্রয়োগ করতে হবে। একটি পূর্ণ বয়স্ক গাছে বছরে ২ ভাগে ৪০ কেজি গোবর, ইউরিয়া ৮০০ গ্রাম, টিএসপি ২০০ গ্রাম একবার বর্ষার আগে ও আরেকবার বর্ষার পরে ব্যবহার করতে হবে। চারা গাছের জন্য আধো ছায়া প্রয়োজন। ৩-৪ বৎসর পর ১ মি. নিচের সমস্ত ডাল পালা কেটে দিয়ে শুধু একটা প্রধান কান্ড বাড়তে দিতে হবে।

পোকা মাকড়/ রোগ বালাই:

স্টেম বোরার: তারের গায়ে তুলায় কীটনাশন মিশিয়ে কান্ডের গর্তে প্রবেশ করানো পর গর্তের মুখ বন্ধ করে দিতে হবে।

মিলিবাগ ও লিফ মাইনার: ম্যালথিয়ন ২ মি.লি/ লিটার স্প্রে করতে হয়ে।

লিফ স্পট: ডাইথেন এম ৪৫, ২ গ্রাম/ লিটার স্প্রে করতে হবে।

সুটি মোল্ড: মিলিবাগ বা অন্য পোক এ ছত্রাকটি বয়ে আনে। থিউভিট ২ গ্রাম/ লি পানিতে মিশিয়ে ছিটালে ছত্রাকটির আক্রমণ রোধ করবে আর পারফেকথিউন ২ মিলি/ লি. মিলিবাগ ধ্বংস করবে।

পুষ্টিগুণ ও ব্যবহার: সুস্বাদু মিষ্টি ফল। শর্করা, আমিষ, চর্বি, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, লোহা ও ভিটামিন সি সমৃদ্ধ। বীজ শুকিয়ে চূর্ণ করে ডায়াবেটিকের ঔষধ হিসেবে কোথাও কোথাও ব্যবহার করা হয়।

কামরাঙ্গা 

কামরাঙ্গা Averrhoa carambola L., Osalidaceae পরিবারভূক্ত ফল। মাঝারী উঁচু গাছেল শাখায় ও কান্ডে ছোট ছোট ফুল হয়। ফল পাঁচটি শিরে বিভক্ত থাকে টক, টকমিষ্টি ও মিষ্টি। এ তিন ধরনের ফল দেখা যায়। বর্তমানে থাইল্যান্ড থেকে মিষ্টি কামরাঙ্গা বলে একটি জাত এসেছে যার ফল বেশ রসাল ও মিষ্টি বলে- মানুষের কাছে বেশ সমাদৃত হয়ে উঠেছে। সব রকম মাটিতেই এ গাছটি বাঁচতে পারে- তবে অতিরিক্ত পানি সহ্য করতে পারেনা বলে ভাল নিকাশের ব্যবস্থার প্রয়োজন। সাধারণতঃ বীজ থেকে চারা করা যায়- তবে গুটি ও জোর করমে ও বংশ বিস্তার করা চলে।

পুষ্টিগুণ ও ব্যবহার: কামরাঙ্গায় ভিটামিন এ ও সি প্রচুর পরিমাণে বিদ্যমান। ফলে শর্করা, আমিষ ও চর্বি রয়েছে। এছাড়া ক্যালসিয়াম, লৌহ ও খাদ্যশক্তি রয়েছে। টক ফল আচার ও জেলি তৈরিতে ব্যবহার করা যায়।

জাম

জাম (Indian Blackberry): Syzygium cuminii L.Myrtaceae পরিবারভুক্ত, চিরহরিৎ একটি লোভনীয় অথচ তুলনামূলক ভাবে সস্তা দামের একটি ফল। রাস্তার ধারে, হাট-বাজারে ও বাড়ীর আঙ্গিনায় বিনা যত্নে এ গাছ দাড়িয়ে থাকে জৈষ্ঠ মাসে ফল পাকার সময় গাছের মাথায় শালিক, কাক, বুলবুলির ভোজ লেগে যায়। মুখরোচক রসাল ও  আকর্ষনীয় রং এর জন্য এর চাহিদা প্রচুর আর বানিজ্যিক সম্ভাবনা ও যথেষ্ট। জামের খাদ্যমান ও বেশ উন্নত। তবুও পরিকল্পিত বাগানে এর স্থান নেই। গাছ বেশ বড় হয় পানিতে ও দাড়িয়ে থাকতে পারে। বাংলাদেশের সকল অঞ্চলে দেখা যায়।

জাত: কোন নির্বাচিত জাত নেই। ছোট, মাঝারি, লম্বাটে ও বড় গোলাকার কালজাম- বলে জামের জাতগুলোর নাম প্রচলিত রয়েছে।

বংশঃ বিস্তার: বীজ দ্বারাই বংশ বিস্তার করা হয়। ভিনিয়ার কলম ও চোখ কলমেও সফলতা আসে। ১ বছর বযসের চারায় কলম করতে হয়।

উৎপাদন পদ্ধতি: প্রায় ১ মি: চওড়া ও গভীর গর্ত ২০ কেজি গোবর মাটির সাথে মিশিয়ে বিচি বা চারা লাগানো যায়। জাম গাছে বাংলাদেশে কোথাও কোন সার দেয়ার প্রচলন নেই কোন রকম যতœ ছাড়াই জাম গাছে প্রতি বচর প্রচুর পরিমানে ফল হয়। শিকড় অনেক নিচে যায় বলেই প্রতিনিয়ত মাটির নতুন স্তর থেকে খাবার সংগ্রহ করে নিতে পারে।

পেকামাকর ও রোগ বালাইঃ জাম গাছের তেমন কোন পোকামাকড় দেখা যায়না। পাকা অবস্থায় পাখির উপদ্রব হয়।

ফলন: ফলের রং লাল উঠলেই বোঝা যায় পাকার সময় হয়ে এসেছে। পুরোপুরি পাকা জামের রং গাড় বেগুনি বা কালচে। একটি গাছ ৩০০ থেকে ৫০০ কেজি জামের ফলন হতে পারে। গাছে ঝাকি দিয়ে নিচে জাল ধরে ফল সংগ্রহ করতে হয়।

পুষ্টিমান ও ব্যবহার: আমিষ, চর্বি, শর্করা, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, লোহা ও খাদ্য শক্তিতে সমৃদ্ধ জামের ফল। টসটসে রসার জাম থেকে বেশ ভাল। রস থেকে উৎকৃষ্ট মানের ভিনেগার তৈরি হয়। রস পানীয় হিসাবে সমাদৃত। বিচির গুড়ো ডায়বেটিক রোগের ঔষধ, কচি পাতা চা এর সাথে মিশিয়ে পান করলে পেটের পীড়ার উপসম হয়। একটু খানি জামের রস পানে ডায়রিয়া ভাল হয়। লবন, মরিচ দিয়ে মাখানো জাম খুব উপাদেয়। জমি দিয়ে ভালো জেলি, জ্যাম, স্কোয়াস ও আচার তৈরি করা যায়। জামের কাঠ ও বেশ মুল্যবান। ভারত থেকে জামের বিচি ইউরোপে রপ্তানী করা হয়।

কাজু বাদাম

কাজু বাদাম (Cashewnut): Anacardium Occidental., Anacardiaccae পরিবারের ফল। ছোট ঝোপাল গাছ। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ে পরিকল্পিত ভাবে চাষ আরম্ভ হয়েছে। এ ছাড়াও অন্য যে কোন স্থানেই এর আবাদ হতে পারে।

বংশ বিস্তার: বীজ থেকে চারা তোলা যায় তবে ভাল জাতের জন্য কলম করা অত্যাবশ্যক। ফাটল অথবা ভিনিয়ার কলমে এর বংশ বৃদ্ধি করা যায়। বেশ কিছু কাল পানির অভাব সহ্য করতে পারে।

জাত: বাংলাদেশে উল্লেখ যোগ্য কোন জাতের নাম করণ হয়নি। তবে ভারতের ঠজ-২, ইচচ-২, এবং শ্রিলংকার ত্রিনিদাদও কন্দাচি সুখ্যাত।

উৎপাদন পদ্ধতি: ৩ মাস থেকে ১ বৎসর বয়সের চারায় কলম করা যাবে। কলম করার ৬ মাস পর চারা লাগানো হয়। জুলাই-আগষ্ট মাসে ৭.৫x৭.৫ মি. দূরত্বে ৬০x৬০x৬০ সে. মি. গর্তে চারা লাগাতে হয়। গর্তে ১৫ কেজি গোবর ও ৫০০ গ্রাম টি,এস,পি মাটির সাথে মিশিয়ে গর্ত ভরে দিতে হয়। চারা লাগানোর আগে ৮-১০ দিন গর্ত উন্মুক্ত রেখে রোদ লাগাতে পারলে ভালো হয়। এর পরের বছর প্রতি গাছে ২৫০ গ্রাম ইউরিয়া, ২০০ গ্রাম টি,এস,পি ও ২০০ গ্রাম এম.পি সার প্রয়োগ করতে হবে। বয়স বৃদ্ধির সাথে সারের পরিমান ও কিছুটা বাড়াতে হবে। একটি ফলন্ত গাছে ২০ কেজি জৈব সার, ৫০০ গ্রাম ইউরিয়া, ৫০০ গ্রাম টি,এস,পি ও ৫০০ গ্রাম এম.পির প্রয়োজন হবে। সারের অর্ধেক মে-জুন ও বাকি অর্ধেক সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে প্রয়োগ করা ভালো।

পরিচর্যা: পানি যাতে আটকে না থাকে সে দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। প্রতি বছর অতিঘন কিছু ভাল ছাটাই করা প্রয়োজন। প্রথম ৩-৪ বৎসর পার্শ ডাল কেটে একটা শক্ত, সোজা কাঠামো তৈরি করে নিতে হয়ে। ৫ বৎসর বয়সে উপরের মাথার বেশ খানিকটা কেটে দিলে গাছ ঝোপাল হয়ে উঠবে ও ফলন বাড়বে।

পোকামাকড় ও রোগবালাই:

কান্ড ও শিকড় ছিদ্রকারী পোকা: এটি অত্যন্ত ক্ষতিকর পোকা। তুলায় কেরসিন ও আলকাতরা লাগিয়ে ছিদ্রগুলোতে ঢুকিয়ে দিলে পোকা দমনে রাখা যায়। এছাড়া, লিফ মাইনারের আক্রমনও পরিলক্ষিত হয়। ২ মি.লি পাফেকথিয়ন, ১ লি. পানিতে মিশিয়ে ¯েপ্র করে ও পোকা দমন করা যায়। মাঝে মাঝে থ্রিপস পাতার ক্ষতি করে। ম্যালথিওন বা পাফেকথিয়ন ¯েপ্র করলে থ্রিপস ও ধ্বংস হয়।

Tea mosquito bug (Helopeltis antoric) নামক পোকা কাজু বাদামের বেশ ক্ষতি করে। এ পোকা নতুন পাতা, ফুল  ও কচি ফরের রস শুষে নেয়। গাছের অগ্রভাগ শুকিয়ে যায়। ইনডোসালফেন.০৫% ¯েপ্র করলে এ পোক দমন হয়। গাছে আগামরা রোগের আক্রমন মাঝে মধ্যে দেখা যায়। ডায়াথিন এম-৪৫ ২মি.লি. পানিতে মিশিয়ে ¯েপ্র করলে এ রোগ থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে।

ফলন ও ফল সংগ্রহ: ৩-৪ বৎসর বয়সেই গাছে ফল আসতে শুরু করে। বসন্ত কালে ফুল আসে ও গৃষ্ম থেকে বর্ষার শেষ পর্যন্ত ফল সংগ্রহ করা যায়। ফল পেকে মাটিতে পড়ে গেলেই সংগ্রহ করা যায়। ফল পানিতে ডুবে গেলে বোঝা যায় যে ভিতরে বাদাম পুষ্ট রয়েছে। পরিপক্ক ফলের মাংশল অংশ ছাড়িয়ে নিলে ভিতরের বাদাম বের হয়ে আসে যা ধুয়ে নিয়ে ২-৩ দিন শুকিয়ে নিতে হয়। বাদাম সঠিক পদ্ধতিতে সংগ্রহ করে, বাদাম বের করার পওে বিশেষ পদ্ধতির মাধ্যমে বাদাম গুলোকে খাবার উপযোগী করে নিতে হয়। কাচা বাদামে এক ধরনের তেল থাকে- আগুনের উত্তাপে সম্পূর্ন তেল বের করার পরই বাদাম খাওয়ার উপযুক্ত হয়। বর্তমানে যান্ত্রিক উপায়ে বাদাম ভেজে নেয়া ও প্যাকিং করার ব্যবস্থা অনেক দেশেই প্রচলিত হয়েছে। একটি ১০ বৎসর বয়সের গাছ থেকে প্রায় ১০ কেজি বাদাম পাওয়া যায়।

পুষ্টিমান ও ব্যবহার: কাজু বাদামের ফলের সবটুকুই মুল্যবান। বাদামের পুষ্টিমান ও প্রচুর। আমিষ, শর্করা, চর্বি, ক্যালসিয়াম, ফসপরাস, লৌহের মত খনিজ লবন ও ভিটামিন এ, বি-১, রিবোফ্লোবিন, ভিটামিন সি সমৃদ্ধ এ ফলটি। এর আমিষে সকল প্রয়োজনীয় এমাইনো এ্যসিড রয়েছে। এজন্য পুষ্টিমানের দিক থেকে কাজু বাদামকে মাংশ, দুধ ও ডিমের সাথে তুলনা করা যেতে পারে। প্রতি কেজি বাদাম ৬০০০ কেলরি খাদ্য শক্তির যোগান দিতে পারে, যেখানে অন্য দানা ফসলে ৩৬০০, মাংশে ১০০ ও তাজা অন্য কোন ফলে গড়ে মাত্র ৬৫০ কেজি কেলরি পাওয়া যায়। বাদামের চর্বি অতি সহজে হজম হয় এবং ক্ষতিকর চর্বি নয়। কাজু বাদামের ফলটি ভিটামিন সি সমৃদ্ধ। বাদামের খোসা থেকে (CNSL) নামের এক প্রকার আঠাল পদার্থ পাওয়া যায়- যা রং, বার্নিস ও রাবার শিল্পে অত্যন্ত মূল্যবান কাঁচামাল হিসাবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। ফলে কাশি, কফ ও কোস্ট কঠিন রোগের ঔষধ হিসেবে ও কাজুবাদামের ফল ব্যবহার করা হয়ে থাকে। ফলে অহধপধৎফরপ ধপরফ রয়েছে বলে এর ফল খেলে ক্ষত সৃষ্টি হতে পারে। বাংলাদেশে এ ফলটির প্রচুর বানিজ্যিক সম্ভাবনা রয়েছে।

জলপাই

জলপাই (Indian olive): Elaeocarpus floribandus BL., Elaeocarppaceae পরিবার ভূক্ত চির সবুজ বৃক্ষ। গাছ প্রায় ১৫ মি. পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। মে-জুন মাসের ফুল আসে ও নভেম্বর-ডিসেম্বরে ফল হয়। সব ধরনের মাটিতেই জন্মে, তবে উঁচু জমিতে ভালো হয়। এ গাছ অল্পদিনের জন্য বন্যার পনিতে দাড়িয়ে থাকতে পারে। বাংলাদেশের সকল জেলায় বসতবাড়ীর আশে-পাশে জলপাই গাছ দেখা যায়। চট্টগ্রাম ও সিলেটের বনাঞ্চালে প্রচুর দেখা যায়।

বংশ বিস্তার: বীজ দ্বারাই সাধারণত বংশ বিস্তার হয়। বীজ ২দিন পানিতে ভিজিয়ে নিয়ে বীজতলায় স্থাপন করলে অঙ্কুরোদগমে সুবিধা হয়। গুটি কলমে ও বংশ বৃদ্ধি করা যায়। তবে শিকড় গজাতে প্রায় ২ মাস সময় লাগে। ২০০ পি পি এম ওইঅ গুটির স্থানে লাগালে সহজে শিকড় গজায়।

চারা রোপন ও সার প্রয়োগ: মে-জুন মাসে চারা রোপন করতে হয়। ৮ মি. দুরত্বে ৭৫ সেমি চওড়া ও গভীর গর্তে ১৫ কেজি গোবর ৫০০ গ্রাম টিএসপি দিয়ে গর্ত ভর্তি করে চারা লাগাতে হয়। তিন মাস বয়সে ৫০ গ্রাম ইউরিয়া ও ৫০ গ্রাম এমপি উপরি প্রয়োগ করা উচিত। এর পরের বছর গুলোতে বর্ষার আগে একবার ও পরে আর একবার, ২য় ভাগে একই হারে সার উপরি প্রয়োগ করতে হবে। প্রতিটি ফলন্ত গাছে ২০ কেজি জৈব সার এক কেজি ইউরিয়া, ২ কেজি টিএসপি ও ১ কেজি এমপি প্রয়োগ করা যেতে পার্

েপরিচর্যা: ছোট অবস্থায় গাছের চর্তুদিক থেকে আগাছা পরিস্কার করে তুলে ফেলতে হবে। মাঝে মাঝে মরা ও দুর্বল ডালপালা কেটে দিতে হবে। অতিরিক্ত খরার সময় ছোট চারায় সেচ দেয়ার ও প্রয়োজন হতে পারে। জলপাই গাছে তেমন কোন রোগ বালাই নেই।

পুষ্টিমান ও ব্যবহার: ভিটামিন এ ও সি বর্তমান। ফল রসাল ও টক। টক ফল দিয়ে ভালো আচার তেরি হয় যার বানিজ্যিক চাহিদা প্রচুর। বিদেশেও রপ্তানীযোগ্য বলে শুধু আচার তৈরির জন্যই এ ফলটির পরিকল্পনা মাফিক বাগানে চাষ করার প্রয়োজন রয়েছে।

জাম

জাম (Indian Blackberry): Syzygium cuminii L.Myrtaceae পরিবারভুক্ত, চিরহরিৎ একটি লোভনীয় অথচ তুলনামূলক ভাবে সস্তা দামের একটি ফল। রাস্তার ধারে, হাট-বাজারে ও বাড়ীর আঙ্গিনায় বিনা যতেœ এ গাছ দাড়িয়ে থাকে জৈষ্ঠ মাসে ফল পাকার সময় গাছের মাথায় শালিক, কাক, বুলবুলির ভোজ লেগে যায়। মুখরোচক রসাল ও  আকর্ষনীয় রং এর জন্য এর চাহিদা প্রচুর আর বানিজ্যিক সম্ভাবনা ও যথেষ্ট। জামের খাদ্যমান ও বেশ উন্নত। তবুও পরিকল্পিত বাগানে এর স্থান নেই। গাছ বেশ বড় হয় পানিতে ও দাড়িয়ে থাকতে পারে। বাংলাদেশের সকল অঞ্চলে দেখা যায়।

জাত: কোন নির্বাচিত জাত নেই। ছোট, মাঝারি, লম্বাটে ও বড় গোলাকার কালজাম- বলে জামের জাতগুলোর নাম প্রচলিত রয়েছে।

বংশঃ বিস্তার: বীজ দ্বারাই বংশ বিস্তার করা হয়। ভিনিয়ার কলম ও চোখ কলমেও সফলতা আসে। ১ বছর বযসের চারায় কলম করতে হয়।

উৎপাদন পদ্ধতি: প্রায় ১ মি: চওড়া ও গভীর গর্ত ২০ কেজি গোবর মাটির সাথে মিশিয়ে বিচি বা চারা লাগানো যায়। জাম গাছে বাংলাদেশে কোথাও কোন সার দেয়ার প্রচলন নেই কোন রকম যতœ ছাড়াই জাম গাছে প্রতি বচর প্রচুর পরিমানে ফল হয়। শিকড় অনেক নিচে যায় বলেই প্রতিনিয়ত মাটির নতুন স্তর থেকে খাবার সংগ্রহ করে নিতে পারে।

পেকামাকর ও রোগ বালাইঃ জাম গাছের তেমন কোন পোকামাকড় দেখা যায়না। পাকা অবস্থায় পাখির উপদ্রব হয়।

ফলন: ফলের রং লাল উঠলেই বোঝা যায় পাকার সময় হয়ে এসেছে। পুরোপুরি পাকা জামের রং গাড় বেগুনি বা কালচে। একটি গাছ ৩০০ থেকে ৫০০ কেজি জামের ফলন হতে পারে। গাছে ঝাকি দিয়ে নিচে জাল ধরে ফল সংগ্রহ করতে হয়।

পুষ্টিমান ও ব্যবহার: আমিষ, চর্বি, শর্করা, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, লোহা ও খাদ্য শক্তিতে সমৃদ্ধ জামের ফল। টসটসে রসার জাম থেকে বেশ ভাল। রস থেকে উৎকৃষ্ট মানের ভিনেগার তৈরি হয়। রস পানীয় হিসাবে সমাদৃত। বিচির গুড়ো ডায়বেটিক রোগের ঔষধ, কচি পাতা চা এর সাথে মিশিয়ে পান করলে পেটের পীড়ার উপসম হয়। একটু খানি জামের রস পানে ডায়রিয়া ভাল হয়। লবন, মরিচ দিয়ে মাখানো জাম খুব উপাদেয়। জমি দিয়ে ভালো জেলি, জ্যাম, স্কোয়াস ও আচার তৈরি করা যায়। জামের কাঠ ও বেশ মুল্যবান। ভারত থেকে জােিমর বিচি ইউরোপে রপ্তানী করা হয়।

জামরুল

জামরুল (Wax Jambu): Syzygium Samarangense (L) Merr, Myrtaceae পরিবারের সুদৃশ্য বৃক্ষ। বানিজ্যিক ভিত্তিতে আবাদ না থাকলে ও কোন কোন বাড়ীতে বা অফিসের আঙ্গিনায় দেখা যায়। বাংলাদেশের সব অঞ্চলেই দেখতে পাওয়া যায়। থোকা ফোকা ফল দেখতে যেমন সুন্দর, খেতেও সুস্বাদু। এ ফলটির বানিজ্যিক সম্ভাবনা রয়েছে বলে- পরিকল্পনা করে বাগান স্থাপন করা যেতে পারে। খাবার আগেপাকলে মিষ্টতা বাড়ে। বর্ষায় মিষ্টতা কিছুটা কমে যায়। উঁচু বেলে দোয়াশ মাটি এর জন্য উপযুক্ত। পানি দাড়ালে গাছ মরে যেতে পারে- তাই পানি নিষ্কাশনের সুবিধা থাকা দরকার।

জাত: সাদা ও লাল। লাল রং এর জামরুল কয়েক বৎসর আগে এদেশে এসেছে- যা দেখতে সুন্দর এবং খেতে ও সুস্বাদু। বাজারে এর প্রচুর চাহিদা রয়েছে। বীজ ও গুটি কলমে বংশ বিস্তার করা যায়। গুটি কলমে ২ বৎসর পর থেকেই ফল আসে। বীজ থেকে লাগালে ৪-৫ বৎসর লাগে।

উৎপাদন পদ্ধতি: ৯ মি. দূরত্বে ৭৫ সে.মি চওড়া ও গভীর গর্তে ১০ কেজি গোবর ও ৫০০ গ্রাম টিএসপি দিয়ে গর্ত ভর্তি করে চারা রোপন করতে হয়। পরবির্ত বছর গুলোতে একই হারে গোবর, টিএসপি ও ১০০ গ্রাম ইউরিয়া ও ১০০ গ্রাম এমপি বর্ষার আগে ও পরে ২ ভাগে দিতে হবে। ১০ বৎসরের বেমি বয়সের গাছে সারের পরিমান দ্বীগুন হারে দিতে হবে।

পোকামাকড় ও রোগবালাই: বাদুড় জামরুলের ক্ষতি করে। রাতে বাদুড় তাড়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে। ছোট গাছে জাল দিয়ে ঢেকে রাখলে বাদুড় ও অন্যান্য পাখির হাত থেকে ফল রক্ষা করা যায়। ফলে- ফল ছিদ্রকারী পোকার আক্রমন দেখা দিতে পারে। রিপকর্ড ১ মি.লি/ লিটার পানিতে মিশিয়ে ¯েপ্র করা যেতে পারে।

পুষ্টিগুণ ও ব্যবহার: ভিটামিনএ,শর্করা, ক্যালসিয়াম ও লোহা সমৃদ্ধ।

ফলন: প্রতি গাছ থেকে ৩০-৪০ কেজি ফল পাওয়া যায়।

করমচা

করমচা (Karanda): Carissa carandas, Apocynaceae পরিবারের ফল। ঝোপজাতীয়, কাটা বিশিষ্ট গাছ। ফল দেখতে সুন্দর ও বাহারী রং এর।

জাত: রং এর উপর ভিত্তি করে লাল, সাদা ও বেগুনী নামে পরিচিত।

চাষাবাদ ও পরিচর্যা: বর্তমানে গাজীপুর, টাঙ্গাইল, নরসিংদি এলাকায় কিছু কিছু বানিজ্যিক চাষ পরিলক্ষিত হয়। সার ব্যবস্থাপনা, পোকা মাকড় ও রোগ বালাই এর উপর তথ্য অপ্রতুল।

পুষ্টিমান ও ব্যবহার: ফল ভিটামিন সি ও পটাসিয়াম সমৃদ্ধ। এছাড়া যথেষ্ট সর্করা, ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস রয়েছে। করমচার টক ফল বাংলাদেশের টক তরকারীতে কেও কেও ব্যবহার করেন। করমচা থেকে আচার ও তৈরি করা হয়। কাঁচা করমচা রক্ত ক্ষরণ বন্ধ ও শিকড়ের রস চুলকানি বন্ধের ঔষধ হিসাবে ব্যবহার করা হয়।

কাউফল

কাউফল (Kao): Garcinia cowa, Gutiferae পরিবার ভূক্ত ফল। এটি একটি চিরহরিৎ বৃক্ষ। কমলার মত হলুদাভ বা লালচে কমলা বর্ণের ফলগুলো শাখায় ঝুলতে থাকে। ফল টক। পুরু খোসার ভিতরে শাঁসের অংশনিতান্ত কম যার মধ্যে বড় বীজ থাকে বলে খেতে সুখকর নয়। এর তেমন কোন ব্যবহার নেই বলেই- অনাদরে বিনা যতেœ বনে বাদাড়ে কখনো কখনো চোখে পড়ে। ব্যপক ভাবে- কোথাও চাষ হয় না। এ ফলের ব্যবস্থাপনা বা পুষ্টিমান সম্পর্কে তথ্যও নেই।

খেজুর

খেজুর (Wild date palm): phoenix sylvestris. Roxb., Palmae পরিবারভূক্ত একবীজ পত্রী ফল। গাছ লম্বা ও সোজা হয়। স্ত্রী ও পুরুষ গাছ আলাদা হয়। ফেব্র“য়ারী-মার্চ মাসে গাছে ফুর আসে ও আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে ফল পাকে। বাংলাদেশের সব জেলাতেই কম বেশি খেজুর হয়। তবে ফরিদপুর, যশোর, কুষ্টিয়া, নাটোর, ইশ্বরদীতে প্রচুর গাছ দেখা যায়। বাংলাদেশের খেজুর আসলে তেমন উপাদেয় নয়।

ভুমধ্যসাগর অঞ্চলে মধ্য প্রচ্যে যে খেজুর উৎপন্ন হয় তা ভীন্ন জাতের ও ভীন্ন জলবায়ুর ফল। সেগুলোর সাথে বাংলাদেশের খেজুরের তুলনা করা উচিত নয়। ঠিক বাগানে না থাকলেও বাংলাদেশে রাস্তার ধারে, স্কুল বা অফিসের আঙ্গিনায় এমন কি ধান ক্ষেতের আইলেও খেজুর গাছ লাগানো যেতে পারে।

বংশ বিস্তার: সাধারনত বীজ থেকে চারা হয়। উন্নতমানের খেজুর ঙভভ ংযড়ড়ঃ এর মাধ্যমে ও বংশ বিস্তার করা হয়। ঠিক ফলের জন্য নয়, খেজুরের রসের জন্য বাংলাদেশের খেজুর গাছ প্রসিদ্ধ হয়ে উঠেছে।

উৎপাদন পদ্ধতি: বাগানে লাগাতে হলে ৬ কি: দূরত্বে ৭৫ সে.মি গর্তে পাঁকা খেজুরের বিচি রোপন করলেই গাছ পাওয়া যায়। খেজুর গাছে এখনো এ দেশে সার দেওয়ার রেওয়াজ গড়ে উঠেনি। যেহেতু ফল নিু মানের তাই সার না দিলেও গাছ বড় হয়ে ওঠে ও যথা সময়ে রস প্রদান করে। তবে গাছের গোড়া পরিস্কার রাখা ও গোড়ায় মাটি দেয়া প্রয়োজন।

পোকা মাকড় ও রোগ বালাই: গাছে উইপোকার উপদ্রব দেখা দিতে পারে। ওই পোকা মারতে কেরসিন ও যে কোন কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। মাঝে মধ্যে গন্ডার পোকা ও লাল উইভিলের আক্রমন হতে পারে। গাছের শীর্ষ পাতার গোড়ায় চোখা তার ঢুকিয়ে পোকা মারা যায়। লাল ইউভিল দমনে সেভিন ২ গ্রাম/ লি. পানিতে মিশিয়ে ¯েপ্র করতে হয়।

পুষ্টি ও ব্যবহার: খেজুরে প্রচুর পরিমানে শর্করা, খনিজ লবন, ক্যালসিয়াম, লৌহ ও খাদ্য শক্তি রয়েছে। এ ছাড়া আছে নিকটনিক এ্যসিড, ভিটামিন বি-১ ও বি-২। খেজুরের বিচিতে অধিক পরিমানে আমিষও রয়েছে বলে কোথাও কোথাও মুরগীর খাদ্য মিশ্রনে খেজুর বিচির গুড়া ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশের খেজুরের ফলন সম্পর্কে তেমন সঠিক তথ্য নেই- তবে এটা জানা গেছে যে যতœ নিলে প্রতি গাছ থেকে প্রতি বৎসর ২০০ থেকে ৫০০ লিটার বা ৩০-৪০ কেজি গুড় পাওয়া যায়। গাছ লাগানোর ৫-৬ বৎসর পরেই গাছে ফল আসে ও অল্প পরিমানে রস সংগ্রহ করা যায়।

খুদি জাম

খুদিজাম (Tiny black berry): Syzygium cuminii, Myrtaceae পরিবারের একটি ফল। কালজাম ও খুদি জাম একই পরিবারভূক্ত। খুদি জাম আকারে খুবই ছোট একটি ফল কিন্তু এর গাছ অনেক বড়। এটি স্বল্প পরিচিত ফল। এ ফল তাজাও খাওয়া হয় কিন্তু ছোট বলে ফলের তেমন আকর্ষন নেই।

জাত: বাংলাদেশে খুদি জামের অনুমোদিত কোন জাত নেই।

উৎপাদন পদ্ধতিও পরিচর্যা: পরিকল্পিতভাবে চাষ হয় না বলে খুদি জামের চাষ পদ্ধতির কোন তথ্য নেই।

পুষ্টিগুণ ও ব্যবহার: প্রতি ১০০ গ্রাম ফলে ০.১ গ্রাম খনিজ লবন, ৩.৮ গ্রাম আাঁশ. ১.০ গ্রাম আমিষ, ০.৮ গ্রাম চর্বি, ১.৪ গ্রাম শর্করা, ২২ মি. গ্রাম ক্যালসিয়াম, ৪.৩ মি. গ্রাম লৌহ, ০.০৯ মি, গ্রাম ভিটামিন বি-১, ০.০২ মি. ভিটামিন বি-২, ৬০.০ মি. গ্রাম সি, ১২০ মাইক্রোগাম ক্যারোটিন ও ১১ কিলোক্যালরী খাদ্য শক্তি রয়েছে। এছাড়া এত ৯৬.৬ ভাগ জালীয় অংশ রয়েছে। গাছের কচি পাতা পেটের পীড়া নিরাময়ে উপকারী। ফলের বীজ থেকে প্রাপ্ত পাউডার বহুমুত্র রোগের ঔষধ হিসাবেও ব্যবহার হয়। পাকা ফল সৈন্ধব লবন মাখিয়ে ৩-৪ ঘন্টা রেখে চটকিয়ে কাপড়ের পুটলি বেঁধে টানিয়ে রাখলে যে রস বের হয় তা পাতলা দাস্ত, অরুচি ও বমিভাব দূর করে। গাছের ছাল ও পাতা বহুমুত্র রোগের জন্য উপকারী।

কদবেল

কদবেল (Elephant apple): Feronia limonia L., Rutaceae পরিবারের অর্ন্তভূক্ত পত্রপতনশীল বৃক্ষ। নিচের ডালগুলোতে ধারাল কাটা থাকে। ফল প্রায় গোলাকার, শক্ত। বাংলাদেশের সব স্থানে জন্মায় ও রাজশাহী কুষ্টিয়া, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, পার্বত্য চট্টগাম বেশি দেখা যায়। যে কোন মাটিতে জন্মায় তবে উচুঁ নিষ্কাশন যুক্ত মাটিতেই ভালো হয়।

জাত: তেমন কোন উল্লেখ যোগ্য জাত নেই।

বংশ বিস্তার: সাধারণত বীজ থেকেই নতুন চারা হয়।

উৎপাদন পদ্ধতি: ৮ মি. দূরত্বে ৬০ সে.মি চওড়া ও গভীর গর্তে ১০ কেজি গোবর, ৫০০ গ্রাম খৈল, ২৫০ গ্রাম টিএসপি দিয়ে চারা লাগানো যায়। বর্ষার প্রথমে চারা লাগালে বর্ষা শেষে ৫০ গ্রাম ইউরিয়া ও ৫০ গ্রাম এমপি উপরি গ্রয়োগ করতে হবে। এর পর আর একবার দিতে হবে। গাছ যত বড় হবে দশ বৎসর পর্যন্ত সারের পরিমান বৎসরে ১০% হারে বৃদ্ধি করতে হবে।

পোকা মাকড় ও রোগ বালাই: উড আপেল বোরার কদবেলের ভিতরে প্রবেশ করে ফলের ক্ষতি করে। জুন মাসের দিক ফল ছোট থাকতে রোগের ২মি.লি/ লি. পানিতে মিশিয়ে ¯েপ্র করে পোকার উপদ্রব কমানো যায়।

ফলন: ফেব্র“য়ারি-মার্চ মাসে ফুল আসে ও অক্টোবর-নভেম্বরে ফল পাওয়া যায়। প্রতি গাছে ৩০০-৪০০ টি ফল পাওয়া যেতে পারে।

পুষ্টিগুণ ও ব্যবহার: আমিষ, শর্করা, ভিটামিন সি, ক্যালসিয়াম ও খাদ্যশক্তি সমৃদ্ধ। কদবেল যকৃত ও হৃতপিন্ডের পিড়ায় ঔষধি হিসেবে ব্যবহার হয়। টক ফলে লবন মেখে খাওয়ার রেওয়াজও রয়েছে। চাটনি হিসাবে কদবেল ব্যবহার হয়। বিষাক্ত পোকার কামড়ে কদবেলের শাঁষ লাগালে ব্যথা কমে যায়।

আমের রোগ ও তার প্রতিকার

এ্যানথ্রাকনোজ:

এ রোগের আক্রমনে গাছের

১। গাছের পাতা, কান্ড, মুকুল ও ফলে ধূসর বাদামি রঙের দাগ পড়ে।

২। আমের গায়ে কালচে দাগ হয় এবং আম পচে যায়।

৩। কুয়াশা, মেঘাচ্ছন্ন ও ভিজা আবহাওয়ায় এ রোগ ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করে।

প্রতিকার:

১। আমের মেীসুম শেষে গাছের মরা ডালপালা কেটে পুড়ে ফেলতে হবে। কাটা অংশে বর্দোপেষ্ট (প্রতি লিটার পানিতে ১০০ গ্রাম চুন ) লাগাতে হবে।

২। গাছের নিচের মরা পাতা পুড়ে ফেলতে হবে।

৩। গাছে মুকুল আসার পর কিন্তু ফুল ফোটার আগে ম্যানকোজেব গ্র“পের ছতাকনাশক ( যেমন; ডায়থেন এম ৪৫) প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে মিশিয়ে স্প্রে ককরতে হবে। আমের আকার একটু বড় বা মটর দানার মতো হলে ২য় বার স্প্রে করতে হবে।

পাউডারি মিলডিউ:

এ রোগের আক্রমনে

১। আমের মুকুলে সাদা পাউডারের মতো আবরন দেখা যায়।

২। আমের মুকুল ঝড়ে পড়ে।

৩। আক্রান্ত আমের চামড়া খসখসে হয় ও কুচকে যায়।

৪। মেঘলা দিনে বাতাসের মাধ্যমে এ রোগ বেশি বিস্তার লাভ করে।

প্রতিকার:

১। গাছে মুকুল আসার পর একবার এবং ফল মটর দানা আকারের হলে আরো একবার সালফার ( যেমন; রনোভিট) প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে অথবা টেবুকোনাজল বা প্রোপিকোনাজল গ্রুপের ছত্রাকনাশক (যেমন; ফলিকুর ইডব্লিউ ২৫০ বা টিল্ট ২৫০ ইসি) প্রতি লিটার পানিতে ০.৫ মিলি হারে ভালভাবে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।

ভোমরা পোকা দমন:

আমের ভোমরা পোকার কীড়া আমের গায়ে ছিদ্র করে ভিতরে ডুকে শাস খায়। সাধারণত কচি আমে ছিদ্র করে এরা ভিতরে ডুকে এবং ফল বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ছিদ্রটি বন্ধ করে দেয়। এ জন্য বাইরে থেকে আমটি ভাল মনে হলেও ভিতরে কীড়া পাওয়া যায়। একবার কোন গাছে এ পোকার আক্রমণ হলে প্রতি বছরই সে গাছটি আক্রান্ত হয়ে থাকে। ক্রমে ক্রমে পার্শ্ববর্তী গাছসমূহে তা ছড়িয়ে পড়ে।

প্রতিকার:

১। আম গাছের মরা ও অতিরিক্ত পাতা, শাখা ও পরগাছা কেটে ফেলতে হবে।

২। প্রতি লিটার পানিতে ২ মিলি হারে লিবাসিড ৫০ ইসি বা ডায়াজিনন ৬০ ইসি বা সুমিথিয়ন ৫০ ইসি মিশিয়ে ১৫ দিন পর পর ২ বার স্প্রে করতে হবে। 

অরবরই

অরবরই (Stargooseberry):Cicea acida L., Euphorbiaceae পরিবারভূক্ত মাঝারী আকারের পত্র পতনশীল বৃক্ষ। জুন-আগস্ট মাসে ফল দেখা যায়। ফল টক। লিভারের অসুখে এ ফলের রস ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশে এর পরিকল্পিত আবাদ নেই। সার প্রয়োগ ও রোগ বালাই সম্পর্কে তেমন তথ্য নেই। বাংলাদেশে সকল স্থানেই কোন কোন বাড়ীর আঙ্গিনায় দু-একটা গাছ পাওয়া যায়।

পেঁপে চাষ

পেঁপে বাংলাদেশের একটি অন্যতম জনপ্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ ফল। শুধু ফলই নয়, সবজি হিসেবেও এর ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। এটি স্বল্পমেয়াদী সুস্বাদু, পুষ্টিকর এবং ওষুধি সম্পন্ন। আমের পরই ভিটামিন-এ এর প্রধান উৎস হলো পাকা পেঁপে। তাছাড়া কাঁচা পেঁপেতে ‘পেপেইন’ নামক এক প্রকার পদার্থ আছে, যা আমাদের খাদ্য দ্রব্য হজমে সাহায্য করে। তাছাড়া অজীর্ণ, কৃমি সংক্রমণ, আলসার, একজিমা, কিডনি রোগ, পাকস্থলির রোগ এসব নিরাময়েও কাঁচা ও পাকা পেঁপে হিতকর।

জাত:

বাংলাদেশে পেঁপের আধুনিক জাত হচ্ছে ‘শাহী পেঁপে’ যার প্রাতিষ্ঠানিক নাম ‘বারি পেঁপে-১’। এছাড়াও স্থানীয় ও বিদেশী হাইব্রিড জাতের পেঁপের চাষ আমাদের দেশে হয়ে থাকে।

জাত নির্বাচন:

পানি নিকাশের সুবিধাযুক্ত উঁচু ও মাঝারি উঁচু জমি এবং দো-আঁশ ও এঁটেল দো-আঁশ মাটি পেঁপে চাষের জন্য উপযোগী। তাছাড়া যেসব মাটিতে প্রচুর রস ধারণের ক্ষমতা থাকে, সেসব মাটিতে বিনা সেচেও ভালোভাবে পেঁপে চাষ করা যায়। তবে অম্লযুক্ত মাটিতে পেঁপের চাষ করা উচিত হবে না।

বীজ বপন:

অতিবর্ষণের সময় ব্যতীত প্রায় সারাবছরই পেঁপে চাষ করা যায়। তবে কার্তিকের মাঝামাঝি থেকে পৌষের মাঝামাঝি এবং মাঘের মাঝামাঝি থেকে চৈত্রের মাঝামাঝি বীজ বপনের উপযুক্ত সময়। শাহী পেঁপের ক্ষেত্রে এক হেক্টর পরিমাণ জমির জন্য বীজ লাগবে ১৪০-১৬০ গ্রাম এবং চারা লাগবে ৭৫০০টি (২ মিটার দূরত্বে রোপণ করলে)।

চারা উৎপাদন:

বীজতলা ছাড়াও পলিথিন ব্যাগে চারা উৎপাদন করা যায়। এজন্য ১৫ দ্ধ ১০ সে.মি. আকারের পলিথিন ব্যাগে সমপরিমাণ বালি, মাটি ও পচা গোবরের মিশ্রণ ভর্তি করে ব্যাগের তলায় ২-৩টি ছিদ্র করতে হবে। তারপর সদ্য সংগৃহীত বীজ হলে প্রতি ব্যাগে ১টি করে আর পুরাতন হলে ২-৩টি বীজ বপন করতে হবে। তবে খেয়াল রাখতে হবে বীজ যেনো সুস্থ সবল ও রোগমুক্ত হয়। ব্যাগে একের বেশি চারা রাখা উচিত নয়। বীজ বপনের পর হালকা সেচ দিতে হবে। ২০-২৫ দিন বয়সের চারার ১-২% ইউরিয়া স্প্রে করলে চারার বৃদ্ধি ভালো হয়।

মাদায় চারা রোপণ:

বীজতলায় বা পলিথিন ব্যাগে উৎপাদিত ২মাস বয়সের চারা জমিতে মাদা বা গর্ত করে রোপণ করতে হবে। মাদা তৈরির সময় এক মাদা থেকে অপর মাদার দূরত্ব রাখতে হবে ২ মিটার এবং মাদার আকার হবে দৈর্ঘ, প্রস্থ ও গভীরতায় প্রায় ৬০ সে.মি. । প্রতি মাদায় ৩টি করে চারা রোপণ করতে হবে। দু’সারির মাঝামাঝি নালার ব্যবস্থা রাখলে সেচ বা বৃষ্টির অতিরিক্ত পানি নিকাশের সুবিধা হবে।

সার প্রয়োগ:

প্রতি গর্তে নিুরূপ সার ব্যবহার করতে হবে-

সারের নাম          পরিমাণ

জৈব সার              ১২-১৫ কেজি

টিএসপি               ৫০০ গ্রাম

জিপসাম              ২৫০ গ্রাম

 বোরাক্স                ২৫-৩০ গ্রাম

জিংক সালফেট  ১৫-২০ গ্রাম

চারা লাগানোর পর গাছে নতুন পাতা আসলে ইউরিয়া ও এমপি সার ৫০ গ্রাম করে ১ মাস অন্তর প্রয়োগ করতে হবে। গাছে ফল আসলে এ মাত্রা দ্বিগুণ করতে হবে।

অন্তর্বতীকালীন পরিচর্যা:

* পেঁপে গাছ পুরুষ, স্ত্রী কিংবা উভয লিঙ্গেও মিশ্রণ হতে পারে। প্রতি মাদায় ৩টি করে পেঁপের চারা রোপণ করতে হয়। পরে গাছে ফুল আসলে প্রতি মাদায় একটি করে স্ত্রী অথবা উভয় লিঙ্গ গাছ রেখে বাকিগুলো কেটে ফেলতে হবে। পরাগায়নের জন্য প্রতি ১০-১৫টি স্ত্রী গাছের জন্য একটি পুরুষ গাছ রাখতে হবে।

* বেশি করে পেঁপে ফলানোর জন্য অনেক সময় কৃত্রিম পরাগায়ন দরকার হয়। সকাল বেলায় সদ্য ফোটা পুরুষ ফুল সংগ্রহ করে এর পাঁপড়িগুলো ছিঁড়ে ফেলে দিয়ে পুংকেশর স্ত্রী ফুলের গর্ভ কেশরের উপর ধীরে ধীরে, ২-৩ বার ছোঁয়ালে পরাগায়ন হবে। এভাবে একটি পুরুষ ফুল দিয়ে ৫-৬টি স্ত্রী ফুলের পরাগায়ন করা যেতে পারে।

* পেঁপে গাছ ঝরে পড়ে যেতে পারে অথবা বেশি পরিমাণে ফল ধরলে কাত হয়ে যেতে পারে বা ভেঙ্গে যেতে পারে। তাই গাছকে রক্ষা করার জন্য বাঁশের খুঁটি পুঁতে কাণ্ডের সাথে বেঁধে দেয়া দরকার।

* শীতকালে প্রতি ১০-১২ দিন এবং গ্রীষ্মকালে ৬-৮ দিন অন্তর পেঁপের জমিতে সেচ দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে এবং সেচের অতিরিক্ত পানি যাতে নালা দিয়ে বের হয়ে যেতে পারে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

রোগ বালাই:

পেঁপে গাছে কাণ্ডপচা, মোজাইক কিংবা পাতা কোঁকড়ানো রোগ দেখা দিতে পারে। কাণ্ড পচা রোগ হলে গাছের গোড়ায় বাদামী বর্ণের পানি ভেজা দাগের সৃষ্টি হয়। আক্রান্ত চারা গাছ মরে যায় এবং ঢলে পড়ে। এর প্রতিবার হিসেবে রোগাক্রান্ত চারা গাছ উঠিয়ে পুড়িয়ে ফেলতে হবে।

এছাড়া রিডোমিল এম- জেড-৭২ ছত্রাকনাশক প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে মিশিয়ে আক্রান্ত কাণ্ডে ছিটিয়ে দিলে সুফল পাওয়া যাবে। মোজাইক রোগের কারণে গাছের পাতায় সবুজ ও হলুদ রঙয়ের দাগ পড়ে, পাতা খর্বাকৃতির হয় ও কুঁকড়ে যায়। আর পাতা কোঁকড়ানো রোগে পাতা মারাত্মকভাবে কুঁকড়ে যায়। পেঁপের ফলন এতে অস্বাভাবিকভাবে হ্রাস পায়। যথাক্রমে জাব পোকা ও সাদা মাছি এ রোগ দু’টি ছড়ায়। ম্যালাথিয়ন নামের কীটনাশক প্রতিলিটার পানিতে ২ মি.লি. হারে মিশিয়ে ৫-৭ দিন পর পর আক্রান্ত গাছে ছিটিয়ে এসব পোকা দমন করতে হবে। এতে রোগের ব্যাপকতা বহুলাংশে কমে যাবে।

ফল সংগ্রহ ও ফলন:

সবজি হিসেবে সবুজ ফল সংগ্রহ করা যাবে। তবে ফল হিসেবে পেঁপে যখন হলদে বা কমলা রঙ ধারণ করবে, তখন সংগ্রহ করা উচিত। ভালোভাবে চাষ করলে প্রতিটি পেঁপে গাছ থেকে ৩০-৬০টি ফল বা হেক্টর প্রতি ৩০-৩৫ টন ফলন পাওয়া যাবে।

দিনে একটি পেঁপে খাও/বাড়ি থেকে বদ্যি তাড়াও

শরিফা

শরিফা (Custard apple): Annona squamosa l. Annonaceae পরিবারভুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণফল। ছোট গাছে মিষ্টি ও সুস্বাদু ফল হয়। ফলের বাণিজ্যিক গুরুত্ব ও রয়েছে বেশ। পরিকল্পনা মাফিক বাগান খুব একটা দেখা যায় না। বেশীর ভাগই বসতবাড়ীর আঙ্গিনায় চাষ হয়। বাংলাদেশের সব স্থানেই কম বেশী দেখা যায়। দো-আঁশ ও বেলে দো-আঁশ মাটিতে ভাল জন্মে। সাধারণতঃ বীজ দ্বারাই বংশ বিস্তার হয়।

চারারোপন ও সার প্রয়োগ: মে-জুন মাসে ৫মি. দূরত্বে ৩০ সে.মি. চওড়া ও গভীর গর্তে বীজ বা চারা লাগাতে হয়। প্রতি গর্তে ১০ কেজি গোবর ও ১০০ গ্রাম টিএসপি দিতে হয়। এরপর প্রতি বৎসর ১০ কেজি গোবর, ২০০ গ্রাম খৈল, ৭৫ গ্রাম ইউরিয়া, ২০০ গ্রাম টিএসপি ও ২০০ গ্রাম এমপি প্রয়োগ করতে হয়। এ সারের অর্ধেক বর্ষার আগে ও অর্ধেক বর্ষার পরে প্রয়োগ করতে হবে।

পরিচর্যা: দুর্বল ডালপালা ছাটাই করতে হবে।

ফল সংগ্রহ ও ফলন: লাগানোর ৩ বছর পরে ফল দেয়া শুরু করা ও ১০-১২ বৎসর পর্যন্ত ফল দেয়া। ফল পাকলে গায়ের রং উজ্জল হয়ে উঠে।

রোগবালাই: মাঝে মদ্যে মিলিবাগ দেখা যায়। রোগের ২ মি.লি/ লি. পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করা যায়।

পুষ্টিগুণ ও ব্যবহার: এ ফলে প্রচুর পরিমাণে শর্করা, খাদ্যশক্তি ও খনিজ দ্রব্য বিদ্যমান রয়েছে। মিষ্টি ফল হিসাবে সমাদৃত। বীজ বেশী থাকলেও সুস্বাদু বলে মানুষ শরিফা পছন্দ করে। কাচা ফল, পাতা ও বীজ থেকে কীটনাশক তৈরী করা যায়। নতুন জাত সৃষ্টি করে ও শঙ্করায়ীত করে ফলের বীজ কমিয়ে বা বীজহীন করে এ ফলের উন্নতি সাধন সম্ভব।

সাতকরা

সাতকরা (Citrus macroptera): Rutaceae পরিবার একটি ফল। সাতকরা একটি রপ্তানী যোগ্য ফল। এর গাছ বৃক্ষ জাতীয় অত্যন্ত কাঁটাময়।

জাত: বর্তমানে এর অনুমোদিত কোন জাত নেই।

চাষাবাদ: এটি বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলে দেখতে পাওযা যায়। চাষাবাদের তথ্য তেমন না থাকলেও বাতাবি লেবুর মতই ব্যবস্থাপনা করা যাবে।

পুষ্টিগুন ও ব্যবহার: সাতকরা একটি ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফল। এছাড়াও এতে কমবেশি সকল ভিটামিন ও খনিজ পদার্থ বিদ্যমান রয়েছে। সাতকরা বমি নাশক ও রুচিবর্ধক। এর খোসা সব্জি হিসাবে অত্যন্ত জনপ্রিয়। খোসা দিয়ে সু-স্বাদু আচার তৈরি হয়।

সুপারী

সুপারী (Betal Nut): Areca catachu L., Palmae পরিবারের ফল। গাছ একবীজ পত্রী, কান্ড সোজা ও দীর্ঘ। প্রায় ২৫ মি. পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। বাংলাদেশের বরিশাল ও নোয়াখালী জেলায় প্রায় প্রতি বাড়ীতে এবং অন্যন্য জেলায় প্রচুর হয়। প্রায় ৫০-৬০ বছর পর্যন্ত ফল দেয়া। শিকড় তির্যকভাবে পাশে ছড়ায় বড় জোর ১মি. গভীরে প্রবেশ করে। বছরে ৪-৫ টি পাতার গোড়া থেকে ফুলের ছড়া বের হয়। স্বপরাগায়ন সম্ভব নয়, কারণ স্ত্রী ও পুরুষ ফুল একই সময়ে ফোটে না (উরপযড়মধসু)।

জাত: রংপুরী, বরিশালী, পাটগ্রামী ইত্যাদি।

উৎপাদন পদ্ধতি: ক্ষরা বা অতি ভেজা মাটি উভয়টি ক্ষতিকর। উঁচু দো-আঁশ বা বেলে দো-আঁশ মাটি শ্রেয়। পাকা বীজ সংগ্রহের পর পরই বীজ তলায় লাগানো উচিত। ছায়া যুক্ত স্থানে পুকুর পাড়ের ঢালে বীজতলা তৈরি করা যায়। ৫ সে.মি দূরে সারি করে ৩ সে.মি গভীরে বীজ পুতে দিতে হবে। বীজতলায় সবসময় সেচ দিতে হয়, আবার আটকানো পানি বের করে দিতে হব্ েবপনের ৫০-৬০ দিন পর চারা গজায় এবং ১ বৎসর বয়সের চারা রোপনোযোগী হয়। ২ মি. দূরত্বে ৪৫ সে.মি গর্ত করে সার মিশ্রিত মাটি দিয়ে গর্ত ভরে দিয়ে ১০-১২ দিন পর চারা লাগাতে হয়। ১০ কেজি গোবর ৫০০ গ্রাম খৈল, ১৫০ গ্রাম টিএসপি ও ২ কেজি ছাই গর্তে দিতে হবে। ৩ মাস পর পর দুইবারে ১০০ গ্রাম ইউরিয়া ও ১০০ গ্রাম উইরিয়া ও ১০০ গ্রাম এমপি দুই ভাগে দিতে হবে। খরা মৌসুমে সেচ ও বর্ষায় নিকাশের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। ৫-৬ বৎসর বয়সের চারায় ফল ধরে। তবে ১০ বৎসর বয়সে পূর্ণ ফল দান করে। প্রতি গাছে ৫০০টি সুপারী ধরে।

রোগবালাই: গোড়া কাচা রোগে শিকড় পচে যায়। জমে থাকা পানিতে এ রোগ হয়। ডাইথিন এম-৪৫ ২মিলি. বা ৩০ গ্রাম কপার অক্সিক্লোরাইড ৬ লিটার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করলে রোগ দমনে রাখা যায়। পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে।

ফল ও কৃড়ি কাঁচা রোগে কচি ফল ও ফুল পচে যায়। থিওভিট ২ গ্রাম/ লি স্প্রে করলে উপকার পাওয়া যায়।

ক্ষুদে মাকড়সা: লাল ও সাদা মাকড়সা পাতার নিচে বসে রস চুষে পাতা ঝলসে যায়। ঘবড়ৎড়হ ২ মি.লি/ ১ লি. পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।

গোবরে পাকা: পোকা ধরে মেরে ফেলে অথবা ফুরাডন ২০ গ্রাম পানিতে মিশিয়ে গোড়ায় দিতে হবে।

পুষ্টিগুণ ও ব্যবহার: খাদ্য শক্তি, ক্যালসিয়াম ও অন্যান্য খনিজ লবনে সমৃদ্ধ। অতি পরিচিত চর্ব্য বস্তু। হজম শক্তি বৃদ্ধি করে, সুপারীর রস হৃদরোগীদের জন্য উপকারী বলে শোনা যায়।

তাল

তাল (Paimira Lalm): Borassus Flabellifer L., Palmae পরিবারভূক্ত একবীজ পত্রী গাছ। বড় গাছ বেশ সোজা ও লম্বা হয়। পুরুষ ও স্ত্রী গাছ আলাদা হয়। সব ধরণের মাটিতে জন্মে। পানিতে অনেকদিন দাড়িয়ে থাকতে পারে। অত্যন্ত ধীর গতিতে এর বর্ধন হয়। বীজ থেকে নতুন গাছের জন্ম হয় ফেব্র“য়ারী-মার্চ এ ফুল আসে ও আগস্ট-সেপ্টেম্বর ফল পাঁকে। পরিকল্পনাহীন ভাবে রাস্তার ধারে বাড়ীরে পাশে, খোলা জায়গায় আপনা আপনিই বেড়ে উঠে তাল গাছ। বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলে এ গাছটি কম দেখা যায়। চারা লাগানোর পর ফল ধরতে প্রায় ১০ বৎসর সময় লেগে যায়। ২০ বৎসর পর পুরা মাত্রায় ফল ধরে।

জাত: বারো মাস যে গাছে তাল থাকে তাকে বারেমাসি জাত বলে।

উৎপাদন পদ্ধতি: সুশৃঙ্খল ভাবে বাগান আকারে এদেশে তাল চাষের প্রচলন নেই, তাই জাত নির্বাচন ও পরিচর্যার তেমন কোনপ্রাধান্য আসেটি। তবে গাছের বৃদ্ধি ও ভালো ফলনের জন্য সার প্রয়োগ করা উচিত। বাগান আকারে করতে হলে ৬ মিটার দূরত্বে  ৯০ সে.মি. চওড়া ও গভীর গর্ত করে ৮-১০ মাস বয়সের চারা লাগানো যায়, প্রতি গর্তে১০ কেজি গোবর ও ১ কেজি হাড়ের গুড়ো দেওয়া চলে। প্রতিটি গাছে প্রায় ২০০ টি ফল আসে। মে-জুলাই মাসে চারা লাগানো যায়। লাগানোর সময় খেয়াল রাখতে হবে কান্ডর কোন অংশ মাটির নিচে না যায়।

পুষ্টিগুণ ও ব্যবহার: তালে প্রচুর খাদ্যশক্তি ও শর্করা রয়েছে। তালের রসে ১২% চিনি থাকে। তালের ফলের অন্যান্য গুণ কী আছে তার সঠিক তথ্য জানা নেই। পুরুষ ফুলের ঝঢ়রশব বা পুষ্প মঞ্জুরী থেকে মিষ্টি রস বের করে চিনি তৈরি করা যায়। ফলের কচি শাঁস বেশ সুস্বাদু। পাকা ফল ও মিষ্টি বলে রস চিপে নানান ধরনের পিঠা ও মিষ্টি তৈয়ার করা যায়। তালের ফলে ২-৩ টি বিচি থাকে। প্রতি গাছ থেকে প্রায় ৪০০ লিটার রস সংগ্রহ করা যায়।

তেঁতুল

তেঁতুল (Tamaridn): Tamarindrindus indica L., Leguminosae পরিবারভূক্ত। এটি একটি চিরহরিৎ বৃক্ষ। তেঁতুল বাংলাদেশের সব অঞ্চলেই রাস্তার ধারে, বাড়ীর আশে পাশে, বাজারে কিংবা অফিস প্রাঙ্গনে দাড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। যে কোন ধরনের মাটিতেই এটা জন্মে।

জাত: বাংলাদেশের তেঁতুলের কোন জাত নেই। থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়াতে মিষ্টি  তেতুলের জাত রয়েছে। লাল তেঁতুল বলে এক রকমের তেঁতুল আছে যার রং গোলাপী।

বংশ বিস্তার: বীজ দ্বারা বংশ বিস্তার হয়।

উৎপাদন পদ্ধতি ও পরিচর্যা: বাগান আকারে তেতুল বাংলাদেশে চাষ হয় না। সার প্রয়োগের কোন সুপারিশ ও নেই। তেমন কোন অপকারী পোকা মাকড় বা রোগের দেখা মেলে না।

ফসল সংগ্রহ ও ফলন: ৮-১০ বৎসর বয়সের চারা গাছে ফল আসে। একটি প্রাপ্ত বয়সের গাছে ২০০-৩০০ কেজি ফলন হতে পারে। মে-জুলাই মাসে ফুল আসে ও ডিসেম্বর-জানুয়ারীতে ফল সংগ্রহ করা যায়।

পুষ্টিমান ও ব্যবহার: ফলে আমিষ, শর্করা খনিজ লবন রয়েছে। প্রচুর ক্যালসিয়াম, লৌহ ওখাদ্য শক্তি বিদ্যমান। ফলের স্বাদ টক। তরকারিতে ও সরবতে ব্যবহার ও সস তৈরি করা যায়। বীজ থেকে উৎকৃষ্ট ষ্টার্চ পাওয়া যায়-যা বয়ন শিল্পে ব্যবহার করা হয়। ঔষধিমূল্যের জন্য তেতুল বেশ সমাদৃত। হাত জ্বালা, সর্দি-কাশি, ইত্যাদির ঔষধ হিসেবে তেতুল ব্যবহার করা হয়।

তৈকর

তৈকর (Taikar): Garciniaa Pedunculata, Gutliferae পরিবারের ফল। এটি মাঝারি ধরনের চিরহরিৎ বৃক্ষ। বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলে দেখা যায়।

জাত: বারি তৈকর-১ নামের জাতটি প্রাধান্য পাচ্ছে।

বংশ বিস্তার: বীজ থেকে গুটি কলমের সাহায্যে।

উৎপাদন পদ্ধতিঃ বর্ষাকালে বপন করতে হয়। ৬ মিটার দূরত্বে ৬০ মি. চওড়া ও গভীর গর্ত করে ১০ কেজি গোবর, ২০০ গ্রাম ইউরিয়া, টিএসপি ও এমপি ১ কেজি প্রয়োগ করতে হবে। তৈকরে তেমন কোন রোগ বালাই ও পোকা মাকড়ের আক্রমন লক্ষ্য করা যায় না।

ফলন: প্রতি গাছে ৩০০-৪০০ টি ফল পাওয়া যেতে পারে। ফুল আসে আগষ্ট- সেপ্টেম্বরে ও ফল সংগ্রহ করা যায়- এপ্রিল-মে মাসে।

পুষ্টিগুণ ও ব্যবহার: ভিটামিন সি ও খনিজ লবন সমৃদ্ধ ফল। ফলের  স্বাদ কিছুটা টক। সব্জি হিসাবে ব্যবহার হয়।

চারা রাখার র‌্যাক

১.            ধরে নিলাম আমরা ৬০০০ চারার একটি র‌্যাক তৈরী করব। সেক্ষেত্রে (18X4 = 72X12=864) বর্গফুট জায়গা  দরকার হবে। পরিচর্যা করতে চরাচলের জন্য র‌্যাকের চতুর্পার্শে পর্যাপ্ত ফাঁকা জায়গা রাখতে হবে।

২.           কখনো সেডের মধ্যে তাপমাত্র ৩৫ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের বেশি হলে ছাউনির উপরের পিঠে পানি ঢেলে ভিজিয়ে হবে।

৩.           উচ্চতায় প্রতি ৬ ইঞ্চি  তফাতে চারা চিহ্নিত করে নিতে হবে।

৪.           সামনের ‌র‌্যাকের সবচেয়ে ছোট চারাগুলি রাখতে হবে। এর পেছনের ৬  ইঞ্চির বড় মাপের এভাবে প্রতি র‌্যাকের পেছনের র‌্যাকটিতে সামনের র‌্যাকের চারা থেকে ৬ইঞ্চি  বড় মাপের চারা রাখতে হবে।

৫.           কোন অবস্থায় সামনের র‌্যাকের চারা থেকে পেছনের র‌্যাকের ছোট চারা রাখা যাবে না।

৬.           চারা রাখার পর সকল পাতার এপিট-ওপিট ও কান্ড ভালভাবে ভিজিয়ে দিতে হবে। গুলে রস না থাকলে ভিজিয়ে দিতে হবে।

৭.           পরের দিন র‌্যাকে রাখা চারার সকল পাতার এপিট-ওপিট এবং কান্ডে নিম্নে বর্ণিত মিশ্রন ¯েপ্র করে ভাল ভাবে ভিজিয়ে দিতে হবে।

মিশ্রণঃ-

                বিষয়     পরিমান

১.                            পানি      ১ লিটার

২.                           ওকোজিম/ভক্সল সুপার                 ৪ মি.লি./ ১০ মি.লি

৩.                           রিজেন্ট তরল      ২.৫মি.লি.

৪.                           ডাইথেন এম-৪৫               ২.৫গ্রাম

৫.                           থিওভিট               ২.৫ গ্রাম

৬.                           ভাল কোম্পানীর উন্নত মানের যে কোন কীটনাশক               পরিমান প্রস্তুতকারী কোম্পানীর নির্দেশ মত

৮.           প্রতি ২৫-৩০ দিন পরপর উপরোক্ত মিশ্রণ স্প্রে করতে হবে।

৯.           প্রথমবার স্প্রের পর পরবর্তি ২৫-৩০ দিনের মধ্যে ডাইথেন এম-৪৫ এবং থিওভিট বা কোন প্রকার কীটনাশক পুনারয় স্প্রে করার প্রয়োজন নাই।

১০.        শীতে/ গরমে প্রয়োজনমত পানি স্প্রে করে পাতাকে সজীব রাখতে হবে। সাধারণত প্রতিদিন ২-৪ বার পানি স্প্রের করা প্রয়োজন হয়। প্রতিদিন কি পরিমান ও কতবার পানি ¯েপ্র করবেন তা ঐ সময়ের তাপ মাত্রা, আদ্রতা/শুষ্কতা বিবেচনা করে নিজেরো ঠিক করে নিবেন। প্রয়োজন পাতা ভিজে সজীব থাকা, সর্বদা ভিজে থাকা নয়।

১১.         গোড়ার মাটি যেন স্বাভাবিক ভিজা থাকে সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

১২.        শেডে ২৫-৩০ দিন রাখার পর যত দ্রুত সম্ভব চারা লাগিয়ে ফেলতে হবে।

১৩.        যদি র‌্যাকে রাখা চারা প্যাকেট জাত করা হয় তবে চারা পৌছানোর পরপরই প্যাকেট জাত করা শুরু করতে হবে এবং প্রতিটি সেন্টারে প্রতিদিন ন্যূনতম ৬০০০টি চারা প্যাকেটজাত করতে হবে। একাজ সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় লেবার, পলিব্যাগ, সার মিশানো মাটি, শেড, র‌্যাক ও পানির ব্যবস্থা রাখতে হবে।

১৪.        চারা প্যাকেটজাত করার পরপরই ধীরে ধীরে পানি দিয়ে প্যাকেটের সমুদয় মাটি ভালভাবে ভিজিয়ে ঐদিন শেডের নীচে র‌্যাকে রাখতে হবে। পরদিন পূর্ব দিনের প্যাকেটজাত করা চারা মাটিতে বসিয়ে দিতে হবে।

১৫.        চারার প্যাকেটগুলি নিম্নের বর্ণনামত যে কোন প্রকারে মাটিতে বসানো যাবে:-

*             প্যাকেটের উচ্চতার চেয়ে ১-২ ইঞ্চি বেশী গভীর গর্ত করে তার ভেতর চারার প্যাকেটগুলি চওড়ার দিকে পাশাপাশি৫-৬টি এবং লম্বার দিকে সুবিধামত সংখ্যায় পাশাপাশি বসিয়ে প্যাকেটগুলির চতুর্পাশ্বে ফাঁকা জায়গা মাটি ভরাট না করে ফাঁকা রাখতে হবে।এ অবস্থায় গর্তটি পানি দিয়ে পূর্ণবাবে বরে দিতে হবে। এরপর থেকে যকনই প্যাকেটের মাটিতে পানি দেবার প্রয়োজন হবে তখনই পূর্বের মত গর্তটি পানি দিয়ে পূর্ণভাবে ভরে দিতে হবে।। কয়দিন পরপর এভাবে সেচ দিতে হবে। সময়মত প্রয়োজনীয় সার প্রতিটি প্যাকেটে পৃথক পৃথকভাবে প্রয়োগ করতে হবে। যখনই সার প্রয়োগ করা হবে তখনই সেচ দিতে হবে।

*             উপরের বর্ণনামত গর্তের ভিতর প্যাকেটগুলি বসিয়ে প্যাকেটের উপর ১-২ইঞ্চি উচু করে এবং প্যাকেটগুলি চতুর্পার্শ্বে ফাকা জায়গা মাটি দিয়ে ভরাট করে দিতে হবে। এরপর আইল বেঁধে প্যাকেটের উপর পানি বেঁধে দিতে হবে।এরপর থেকে যখনই প্যাকেটের মাটিতে পানি দেবার প্রয়োজন হবে তখনই পূর্বের মত আইল বেঁধে প্যাকেটের উপর পানি বেধে দিতে হবে।কয়দিন পরপর এভাবে সেচ দিতে হবে তা ঐ সময়ের আদ্রতা/শুষ্কতা অনুযায়ী নির্ধারন করতে হবে।সময়মত প্রয়োজনীয় সার প্যাকেটের প্রয়োগ করা হবে তখনই পূর্বের মত সেচ দিতে হবে।

১৬.        উইপোকার উপদ্রপ থাকলে চারা রাখার পূর্বে নিম্নে বর্ণিত মিশ্রণ র‌্যাক, শেড ব্লক ও গর্তের মাটিতে ভালবাবে স্প্রে করতে হবে। প্রতি ২০০ বর্গফুট জমিতে ছিটাতে ১ লিটার মিশ্রণ লাগবে। মিশ্রণঃ-

                বিষয়     পরিমান

৭.                           পানি      ১ লিটার

৮.                           রিজেন্ট তরল      ২.৫মি.লি.

৯.                           ডাইথেন এম-৪৫               ২.৫গ্রাম

১০.                        থিওভিট               ২.৫ গ্রাম

১১.                         ভাল কোম্পানীর উন্নত মানের যে কোন কীটনাশক               পরিমান প্রস্তুতকারী কোম্পানীর নির্দেশ মত

টবের মাটি

টবে চাষ করা ফুল ফল সবজী যেমন ফ্লাট বাড়ীর সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে তেমন সময় অসময়ে আনন্দ বিনোদন এবং রোগ ব্যাধিতে বাড়তি ইমেজ উপশম যোগ করে। টবের স্বল্প মাটিতে একটি উদ্ভিদকে যেহেতু বেঁচে থাকতে হয়। তাই সে মাটি হওয়া প্রয়োজন একটি ভিন্ন ধাচের, টবে চাষ করা প্রায় সব ধরনের উদ্ভিদের জন্য প্রয়োজন শতকার ৭৫ ভাগ নদীর পলি মাটি, ২০ ভাগ নারকেলে ছোবড়ার গোড়া বা কোকো পিট, ৫ ভাগ হাড়ের গোড়া, টিএসপি, এমওপি, ফসফেট, সালফার, নাইট্রোজেন বা ইউরিয়া এবং গোবর সার। টবের মাটি হাল্কা ঝুরঝুরে হওয়া প্রয়োজন, যাতে শেকড় সহজে প্রবেশ করতে পারে এবং বাতাস থেকে অক্সিজেন, নাইট্রোজেন ও জলীয়বাষ্প সংগ্রহ করতে পারে।

মাটির সঙ্গে নারকেলের ছোবড়ার গোড়া পরিমান মত মিশিয়ে নেট দ্ধারা সেঁকে নিতে হবে যাতে কোন ধরনের আবর্জনা না থাকে। এরপর এর মাঝে কিছু পানি দিয়ে স্বল্পভাবে ভিজিয়ে দিতে হবে। স্বল্প ভেজা এ মিশ্রিনে অন্যান্য উপাদান আনুপাতিক হারে মিশিয়ে মিশ্রনকে টবে বা চারা উৎপাদন করা প্যাকেটে পুরতে হবে। এরপর চারা বা বীজ রোপন করতে হবে। বীজের ক্ষেত্রে ৩ ইঞ্চি এবং চারার ক্ষেত্রে ৪ ইঞ্চির অধিক গর্ত করে রোপন করতে হবে। চারা  রোপন করার পরপরই পানি ঢেলে পুরো টবের মাটি ভিজিয়ে দিতে হবে। আর বীজের ক্ষেত্রে পানি দেওয়ার প্রয়োজন নেই যতদিন বীজ অঙ্কুরোদগম না হয় বা বীজ থেকে চারা না গজায়। চারা গজানোর সাথে সাথে সকাল বিকাল পানি দিয়ে টবের মাটি ভিজিয়ে রাখতে হবে। কোন ভাবে টবে পানি জমিয়ে থাকতে দেয়া যাবে না। টবে পানি জমলে গাছের গোড়ায় পচন ধরতে পারে এবং গাছ মারা যায়। গাছ রোগাটে ও নরম হওয়ার সম্ভাবণা বেশী থাকে। টবটির দিকে বিশেষ নজর রাখতে হবে যে সারা দিনে কমপক্ষে ১০ ঘন্টা রোদ থাকা প্রয়োজন। টবের উপর কোন ধরনের ছায়া পড়া উচিত নয়।